অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটাতে সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, চিকিৎসা সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবহার, বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। তাঁর মতে, হাসপাতাল পরিদর্শন কিংবা নতুন নির্দেশনা জারির পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও প্রয়োজন।
১৯৯৯ সালে তারেক রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন শুরু থেকেই স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবিক সহায়তার মতো জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার মনে করেন, মানুষের কল্যাণে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে থেকেও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় জনসেবা, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিষয়গুলোও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সময় টেলিভিশনের ‘ইউসিবি টু দ্য পয়েন্ট’ অনুষ্ঠানে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার বলেন, চিকিৎসাসেবায় কার্যকর পরিবর্তন আনতে হলে শুধু উদ্যোগ গ্রহণ নয়, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
সম্প্রতি সময় টেলিভিশনের ‘ইউসিবি টু দ্য পয়েন্ট’ অনুষ্ঠানে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। আলোচনায় তিনি চিকিৎসাসেবার সংকট, ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতির অব্যবহার, সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ, বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় তাঁর নেতৃত্বাধীন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও জানান।
ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের মতে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এক দিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত সংস্কার, দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি। হাসপাতালের অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেই সেবা নিশ্চিত হয় না; সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, চিকিৎসকেরা দায়িত্ব পালন করছেন কি না এবং রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়মিত যাচাই করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি পর্যায়ে তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তিনি মনে করেন, পরিদর্শনের প্রভাব স্থায়ী করতে হলে সুনির্দিষ্ট মনিটরিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসকদের উপস্থিতি, রোগীদের সুযোগ-সুবিধা এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। কোনো হাসপাতালের সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পর তা সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেই তথ্যও নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। তাঁর বক্তব্য, দেশে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব ও সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে তিন থেকে চার মাস, ছয় মাস, এমনকি এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ক্যানসারের মতো রোগে চিকিৎসা শুরু করতে দীর্ঘ বিলম্ব রোগী ও পরিবারের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
তিনি বলেন, খুলনা ও ফরিদপুরে ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকার ঘটনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোনো যন্ত্র ১৪ বছর ধরে ব্যবহার করা হয়নি। প্রতিটি যন্ত্রের দাম ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা চিকিৎসা সরঞ্জাম কাজে না লাগলে একদিকে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না, অন্যদিকে রোগীদের চিকিৎসার সুযোগও সংকুচিত হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি সেগুলো চালানোর জন্য দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনার পর সেগুলো কত দিন ব্যবহৃত হলো, কত রোগী সেবা পেলেন এবং কী কারণে কোনো যন্ত্র বন্ধ রয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারি সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব।
সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। উদাহরণ হিসেবে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ও রোগীর চাপের ব্যবধান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৭০০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রায় ৪ হাজার রোগী ভর্তি থাকলে চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, খাবার ও অন্যান্য সেবা নির্ধারিত সক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শুধু কর্মীদের দায়িত্বশীলতা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; রোগীর প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী জনবল, অবকাঠামো ও সরবরাহ বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেন তিনি। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সেবা না পেলে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য, চিকিৎসকের পরামর্শ ফি এবং বিভিন্ন সেবার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, সরকারি হাসপাতালের সেবার মান উন্নত করার পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কার্যক্রমেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন।
ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার মনে করেন, কোন হাসপাতাল কী ধরনের সেবা দিতে পারবে, সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও সরঞ্জাম রয়েছে কি না এবং নির্ধারিত মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। নিয়ম লঙ্ঘনকারী হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসা পরীক্ষার মূল্য ও চিকিৎসকদের পরামর্শ ফির ক্ষেত্রেও যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চিকিৎসাসেবা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অংশ হলেও রোগীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
চিকিৎসার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। কোনো হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবার সুযোগ রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করে রোগীকে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থায় সরকারি সহায়তা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা সমন্বয় করা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, রোগী রেফার করার কার্যকর ব্যবস্থা, সেবার মান যাচাই এবং ব্যয় নির্ধারণে স্বচ্ছতা।
স্বাস্থ্যসেবার বাইরেও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন এর নির্বাহী পরিচালক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফাউন্ডেশনটি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে আসছে। দুর্যোগ ও জনস্বাস্থ্যসংকটের সময়ও সংগঠনটি নিজস্ব উদ্যোগে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং করোনাভাইরাস মহামারির সময় জরুরি সহায়তার অংশ হিসেবে অ্যাম্বুলেন্স সেবা, রোগীর বাড়িতে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা জানান তিনি। নিয়মিত মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, ছাগলসহ গবাদিপশু বিতরণ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তার মতো কর্মসূচিও পরিচালিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ফাউন্ডেশনের অর্থায়ন প্রসঙ্গে ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার বলেন, সদস্যদের নিয়মিত অবদান এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে স্বেচ্ছায় অংশ নেওয়া দাতাদের সহায়তায় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষা সহায়তা পাওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের প্রতিবেদন নেওয়া হয়। এতে সহায়তার অর্থ যথাযথ কাজে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার একটি প্রক্রিয়া রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—সেবার মান নিশ্চিত করা, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি-বেসরকারি সক্ষমতার সমন্বয়। তাঁর মতে, কেবল নির্দেশনা জারি কিংবা সাময়িক তৎপরতা দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর করা যাবে না। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহার, চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালন এবং রোগীদের ব্যয়—সব ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এ খাতে সংস্কারের সাফল্য নির্ধারিত হবে সাধারণ মানুষ কতটা সহজে, সময়মতো এবং সাশ্রয়ী ব্যয়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন, তার ভিত্তিতে। সরকারি অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকা, প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল এবং বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ের মতো সমস্যা সমাধানে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে। ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের বক্তব্যের মূল বার্তাও হলো—স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে পরিকল্পনার পাশাপাশি তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে; আর বাস্তবায়নের কেন্দ্রে রাখতে হবে রোগীর স্বার্থ ও জবাবদিহি।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব