খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ৩৩ কিলোমিটারের মধ্যে ১৬ কিলোমিটারই বেহাল। ১৯০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে, হয়েছে দফায় দফায় সংস্কারও। কোথাও নতুন করে পিচ ঢালাই, কোথাও আরসিসি ঢালাই। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন কাজ হচ্ছে না।
বছর না ঘুরতেই উঠে যাচ্ছে পিচ, ভেঙে যাচ্ছে ইটের সলিং, তৈরি হচ্ছে গর্ত। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ৩৩ কিলোমিটারের মধ্যে ১৬ কিলোমিটারই এখন বেহাল। সড়ক মেরামতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও ভোগান্তি কমেনি; বরং ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে যানবাহন ও যাত্রীদের।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহাসড়কটির উন্নয়ন ও পরবর্তী সংস্কারে ছয় বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এরপরও সড়কের বড় একটি অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে গত সাড়ে চার বছরে এ মহাসড়কে ২৬৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২৭ জনের, আহত হয়েছেন ৩৮৩ জন।
এমন পরিস্থিতিতে সড়কের স্থায়িত্ব, সংস্কারকাজের মান ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের জিরোপয়েন্ট থেকে আঠারোমাইল পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হয়। সড়কটির প্রস্থ বাড়িয়ে ১৮ থেকে ৩৬ ফুট পর্যন্ত করা হয়েছিল।
কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে গর্ত দেখা দেয়। পরে নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোজাহার এন্টারপ্রাইজ তিন বছর ধরে সড়কটি মেরামত করে। তাতেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
এরপর সওজ নিজস্ব অর্থায়নে আট দফায় ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কারকাজ করে। পাশাপাশি দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় কিলোমিটার সড়কে কার্পেটিং এবং ২৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অংশে আরসিসি ঢালাই দেওয়া হয়। উন্নয়ন ও পরবর্তী সংস্কার মিলিয়ে ছয় বছরে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮৯ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
এত অর্থ ব্যয়ের পরও সড়কের দুরবস্থা কাটেনি। বরং ৩৩ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক অংশে এখন যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ইটের সলিং ভেঙে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোথাও পিচ উঠে সড়ক উঁচু-নিচু হয়ে গেছে, কোথাও আবার দীর্ঘ অংশজুড়ে ঢেউয়ের মতো আকৃতি নিয়েছে। বর্ষার পানিতে আগের গর্তগুলো আরও বড় হয়েছে। এসব স্থানে যানবাহনকে গতি কমিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সামান্য অসতর্কতায় নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০১৮-২০ সালে সড়ক পুনর্নির্মাণের সময় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল। এ কারণে নির্মাণের পর থেকেই গুটুদিয়া, আঙ্গারদোহাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক ফুলে ওঠে এবং গর্ত তৈরি হয়। একবার মেরামত করার পর কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
তাদের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে অনিয়মের সঙ্গে সওজের কিছু কর্মকর্তার অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে। স্থানীয়দের দাবি, সংস্কারের নামে বারবার বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজের মান ও ব্যয়ের যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও ভোগান্তি কমছে না।
মহাসড়কটির কৈয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা ট্রাকচালক খালেক বলেন, ‘এই সড়কে গাড়ি চালাতে গেলে প্রতিনিয়ত গর্ত সামলে চলতে হয়। চাকা গর্তে পড়লেই গাড়ি এমনভাবে দুলে ওঠে যে চালকের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। ঝাঁকুনিতে আমার গাড়ির কয়েকটি স্প্রিং ভেঙে গেছে। অন্য যন্ত্রাংশও দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। ফলে আয় যা হয়, তার একটা বড় অংশ গাড়ি মেরামতেই চলে যায়।
বাসচালক আকবার বলেন, ‘সড়কের অবস্থা খারাপ হওয়ায় যাত্রীদের নিয়ে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালানো যায় না। ভাঙা অংশে গতি কমাতে হয়, এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগে। যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন, পরিবহন মালিকদেরও ক্ষতি হয়। সড়ক বিভাগ মাঝেমধ্যে গর্ত ভরাট করে, কিন্তু কয়েক দিন পর আবার একই অবস্থা দেখা দেয়।’
মহাসড়কটিতে নিয়মিত চলাচলকারী কয়েকজন পথচারীর ভাষ্য, গর্তে মোটরসাইকেলের চাকা পড়ে অনেকেই দুর্ঘটনায় পড়েছেন। কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ হাত-পা ভেঙে আহত হয়েছেন। বিশেষ করে রাতে গর্তগুলো সহজে চোখে পড়ে না। ফলে অন্ধকারে চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল হক বলেন, ‘সড়কটির নকশাগ ভারবহন ক্ষমতা ২৭ টন। অথচ এই সড়ক দিয়ে ৫২ টন পাথর বহনকারী ট্রাক চলাচল করছে। সড়কের দুর্বল ফাউন্ডেশনের ওপর অতিরিক্ত ভার পড়ায় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’তিনি আরো বলেন,মহাসড়কটির নিচের মাটি ও ফাউন্ডেশন দুর্বল। এ কারণে সড়কটি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। আমরা এমন ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি, যাতে সংস্কারের পর সড়কটি আগের চেয়ে বেশি দিন টেকসই থাকে।’
তিনি জানান, সড়কের ইটের সলিং থাকা নয় কিলোমিটার অংশ আরসিসি ঢালাইয়ে রূপান্তরের জন্য চারটি প্যাকেজে ১০০ কোটি টাকার দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।