ছবি: এএফপিজীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট ও সরকারি নীতির প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে এক দিনে গ্রেপ্তার এক হাজার ৩১৪ জন, স্পেনের বার্সেলোনায় গ্রেপ্তার ১২৮। চেক প্রজাতন্ত্রে সরকারি গণমাধ্যমের অর্থায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রস্তাব ঘিরেও শুরু হয়েছে বিক্ষোভ।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, শিক্ষার মান এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে। ফ্রান্সে সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চেক প্রজাতন্ত্রে সরকারি গণমাধ্যমের অর্থায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে রাজধানী প্রাগে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।
চেক প্রজাতন্ত্রে রোববার রাতে আইনপ্রণেতারা সরকারি গণমাধ্যমের অর্থায়নসংক্রান্ত একটি খসড়া বিলে প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়ার পর বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রস্তাবটি পাস হলে চেক পাবলিক টেলিভিশন ও রেডিওর অর্থায়নে বর্তমানে ব্যবহৃত গৃহস্থালি ফি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটির অর্থায়ন রাষ্ট্রীয় বাজেটের আওতায় নেওয়া হবে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এ পরিবর্তনের ফলে সম্প্রচারমাধ্যমগুলো রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুকি তৈরি হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই বাবিসের মতে, এটি অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়।
গত শুক্রবার নির্ধারিত সূচির বাইরে এনে নিম্নকক্ষে প্রস্তাবটির প্রথম পাঠ উত্থাপন করা হয়। বিরোধী দল ও গণমাধ্যমের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো দ্রুত আইনটি পাসের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। বিলটি এখন চূড়ান্ত ভোটের আগে সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বিক্ষোভের আয়োজকেরা সামনে আরও কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
ফ্রান্সে ১,৩১৪ জন গ্রেপ্তার, আহত ৫৩ পুলিশ সদস্য
ফ্রান্সে গত শনিবারের বিক্ষোভে এক হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় সংঘর্ষে ৫৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে রোববার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো দেশটিতে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে পুলিশ ৭৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সামাল দিয়েছে। এ ছাড়া ২৪টি দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। এসব ঘটনায় কয়েকটি তদন্ত শুরু হয়েছে। সংঘর্ষের পর শনিবার রাতের বাকি সময়ে পরিস্থিতি শান্ত ছিল বলে মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিক্ষোভে বেসামরিক কতজন আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে রোববারের বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে শনিবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরা নুনেজ দুই বিক্ষোভকারীর গুরুতর আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁদের একজন তুলুজে এবং অন্যজন ক্লেরম-ফের শহরে আহত হন।
তুলুজের স্থানীয় প্রশাসন বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, শহরটিতে ২০ বছর বয়সী এক যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। তার হাতে আঘাত লেগেছে। বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া এক স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলেন, ওই যুবকের ডান হাতের বেশ কয়েকটি আঙুল বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, ক্লেরমঁ-ফেরঁ অঞ্চলের প্রশাসন জানিয়েছে, সেখানেও এক ব্যক্তি হাতে আঘাত পেয়েছেন। তবে তার কোনো আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়নি। ফ্রান্সের আঞ্চলিক দৈনিক লা নুভেল রিপাবলিক জানিয়েছে, পোয়াতিয়েতে এক ব্যক্তির বা চোখে আঘাত লেগেছে।
পত্রিকাটির একজন আলোকচিত্রী এএফপিকে জানান, আহত ব্যক্তির বয়স ১৯ বছর। দাঙ্গা পুলিশ কাদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার সময় তিনি আহত হন। তবে শনিবার আহত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব অস্ত্রের কোনটি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্তত কয়েকটি ঘটনায় তদন্ত চলছে।
ফ্রান্সে আগামী এপ্রিল ও মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দুই মেয়াদের সীমা পূর্ণ হওয়ায় ওই নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি বেছে নেওয়া হবে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী ও শ্রমিক ইউনিয়ন আগামী শনিবার আবারও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। সরকারকে চাপে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যেতে চায় তারা। পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্দোলনকারীদের মতে, বেতন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ গত মাসে আন্দোলন শুরু করা শিক্ষার্থীদের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
বামপন্থি শ্রমিক ইউনিয়ন ফেডারেশন সলিদেয়ারের সহপ্রধান মুরিয়েল গিলবার্ট বিএফএম টেলিভিশনকে বলেন, মানুষের ক্ষোভ এক জায়গায় এসে জমা হচ্ছে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও অগ্নিনির্বাপণকর্মীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর অসন্তোষ একই ধারায় মিলিত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গিলবার্ট বলেন, আগামী শনিবার রাস্তায় নেমে আসতে মানুষকে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
স্পেনে গ্রেপ্তার ১২৮, অর্ধেকের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক
স্পেনের বার্সেলোনায় ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে ১২৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার কাতালোনিয়ার আঞ্চলিক পুলিশ জানায়, শহরটিতে রাতভর বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাদের বিষয়ে প্রতিবেদন কিশোর অপরাধবিষয়ক সরকারি কৌসুলির দপ্তরে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন কাতালোনিয়ার পুলিশপ্রধান সিলভিয়া কাতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কালো পোশাক পরা কয়েকজন তরুণকে বার্সেলোনার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে দেখা গেছে। এর আগে তারা শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি সমাবেশে জড়ো হয়েছিলেন। ওই সমাবেশের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আগে থেকে জানানো হয়নি।
পুলিশপ্রধান সিলভিয়া কাতা ঘটনাটিকে অকারণ সহিংসতা বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, মোট ২৩টি স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান ছড়িয়ে পড়লেও আন্দোলনটি ছিল বিশৃঙ্খল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় ও পটভূমি বিশ্লেষণ করছে পুলিশ।
স্পেনে ২৯ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রচার চলছে। এ পরিস্থিতিতে ডানপন্থি বিরোধী দলের নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিবর্তন আসতে হবে স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে।
পর্তুগালে আবাসন সংকটের প্রতিবাদ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রস্থলে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে রাস্তায় তাবু টানিয়ে অবস্থান নেওয়া বিক্ষোভকারীদের একটি দলকে রোববার ভোরে সরিয়ে দেয় পুলিশ। এ সময় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কয়েকজন সামান্য আহত হন বলে জানা গেছে। তবে আহত ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
পর্তুগাল বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম তীব্র আবাসন সংকটের মুখে রয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে দেশটিতে বাড়ির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। নতুন চুক্তিতে বাসাভাড়াও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ সংকটে তরুণেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন।
ইতালি, আলবেনিয়া ও বেলজিয়ামেও সংঘর্ষ
ইতালির রোম ও মিলানে গত শনিবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। এ সময় তারা সরকার ও পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানাতেও শনিবার সরকারবিরোধী সমাবেশে হাজারো মানুষ অংশ নেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। অন্যদিকে, কিছু বিক্ষোভকারী নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য মিলিয়ে ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসেও শনিবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কাদানে গ্যাস ও মরিচের গুড়ার স্প্রে ব্যবহার করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক বিক্ষোভকারীকে পুলিশ সদস্যরা লাঠি দিয়ে আঘাত করেন এবং লাথি মারেন।
অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীরা রাস্তার নির্দেশক চিহ্নসহ বিভিন্ন বস্তু রাস্তার পাশে থাকা স্কুটার ও সাইকেলের স্তূপের ওপর ছুড়ে ফেলেন এবং সেগুলোতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন। পৃথক ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের একটি দলকে ছত্রভঙ্গ করতেও কাদানে গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভের কারণ এক নয়। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সংকট, কোথাও সরকারি নীতি বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অসন্তোষ আন্দোলনের সূত্রপাত করেছে। তবে একাধিক দেশে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।