
একটি সমৃদ্ধ, উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তরুণদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক চাপ মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা গেলে তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও কর্মশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে আরো বেগবান করা সম্ভব।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) বেলা ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের মিলনায়তনে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উদযাপন উপলক্ষে ‘মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে’ মায়ের হাসি মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্লামেন্টের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, এমপি এমন মন্তব্য করেন। এবারের আয়োজনের মুল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জীবনের অভিজ্ঞতা শুনি: সত্যিকারের কথা ও সত্যিকারের পরিবর্তন আনি’।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতি মন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. এস এম জিয়াউদ্দীন হায়দার বলেন, প্রত্যেকেরই মানসিকভাবে সুস্থ থাকা জরুরি। একজন মা গর্ভাবস্থায় মানসিক দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যে থাকলে তার প্রভাব গর্ভের সন্তানের ওপরও পড়তে পারে। তাই সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে গর্ভকাল থেকেই মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারের সঞ্চালনা করেন সংস্থাটির সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখী গাঙ্গুলী। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রধান ও পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুনন্নাহার সুমি এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আবু তৈয়ব আবু আহমেদ।
বক্তারা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছেন একজন মানুষ ও একটি পরিবার, যারা প্রায়ই একাকী এবং নীরবে এ সংকট মোকাবিলা করেন। এখনো অনেকেই মানসিক অসুস্থতাকে রোগ হিসেবে বিবেচনা না করে দুর্বলতা, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, পাপের ফল কিংবা জিন-ভূত বা জাদুটোনার প্রভাব বলে মনে করেন। সামাজিকভাবে ‘পাগল’ তকমা পাওয়ার ভয়ে অনেকে চিকিৎসা নিতে দ্বিধা করেন। পরিবারগুলোও অনেক সময় বিষয়টি গোপন রাখে। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা।
তারা আরো বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী বিষন্নতাসহ মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো এখনো সমাজে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। মায়ের মানসিক সুস্থতা শিশুর বিকাশ এবং পরিবারের সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ‘মায়ের হাসি’ উদ্যোগটি এ বাস্তবতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, বাংলাদেশে প্রতি ছয় জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। অথচ তাদের প্রায় ৯২ শতাংশই কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা পান না। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মূলত শহরাঞ্চলের হসপিটালকেন্দ্রিক। ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হসপিটাল এবং পাবনা মানসিক হসপিটালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। তবে হসপিটালভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজভিত্তিক ফলোআপ ও ডে-কেয়ার সেবার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। বিষন্নতা, উদ্বেগ ও মাদকাসক্তির পাশাপাশি আত্মহত্যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিএইচও-হু) তথ্য উল্লেখ করে ইকবাল মাসুদ বলেন, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যায় ৪ হাজার ৭১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তরুণ ও নারীদের মধ্যে এ সমস্যার প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তবে আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য। এ জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং সামাজিকভাবে সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।
বক্তারা মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এ বিষয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা দূর করা, চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের মিডিয়া ম্যানেজার তরিকুল ইসলাম।