চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু, তাবু থেকে তাবুতে দিন কাটছে গাজার তিন ভাইবোনের

যাযাদি অনলাইন

আন্তর্জাতিক

মায়ের কোলেই বসে ছিল ১২ বছরের জিবরিল। পাশে ছিল তার দুই বোন মারিয়াম ও আয়া। হঠাৎ তাদের আশ্রয় নেওয়া অস্থায়ী

2026-10-25T18:10:38+06:00
2026-10-25T18:10:38+06:00
রোববার ● ২৫ অক্টোবর ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
আন্তর্জাতিক
চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু, তাবু থেকে তাবুতে দিন কাটছে গাজার তিন ভাইবোনের
যাযাদি অনলাইন
প্রকাশ: রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১০ পিএম  
ছবি: মিডল ইস্ট আই
মায়ের কোলেই বসে ছিল ১২ বছরের জিবরিল। পাশে ছিল তার দুই বোন মারিয়াম ও আয়া। হঠাৎ তাদের আশ্রয় নেওয়া অস্থায়ী তাবুতে আঘাত হানে বোমা। চোখের সামনেই মায়ের মৃত্যু দেখে জিবরিল। ওই হামলায় আহতও হয় সে। এরপর থেকে তিন ভাইবোনের জীবন কাটছে এক আত্মীয়ের তাবু থেকে অন্য আত্মীয়ের তাবুতে। গাজায় যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় মা-বাবাকে হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে তারা।

মারিয়াম, আয়া ও জিবরিলের বয়স যথাক্রমে ১৬, ১৪ ও ১২ বছর। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি হামলায় মা ইসলামকে হারানোর পর থেকে তাদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। স্থায়ী আশ্রয় নেই, নেই মা-বাবার স্নেহে বেড়ে ওঠার সুযোগ। স্বজনদের সহযোগিতায় কোনোমতে দিন পার করছে তারা।

এই তিন ভাইবোনের জীবনে স্বজন হারানোর ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে তাদের বাবা নিহত হন। এরপর মা ইসলামই ছিলেন তাদের একমাত্র ভরসা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় গাজা সিটিতে তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাণ বাচাতে মাকে সঙ্গে নিয়ে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় একটি অস্থায়ী তাবুতে আশ্রয় নেয় তারা।

কিন্তু সেখানেও নিরাপদ থাকতে পারেনি পরিবারটি। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ১৯ দিন পর তাদের তাবুতে বোমা হামলা হয়। এতে নিহত হন মা ইসলাম। মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর কোলেই ছিল ছোট ছেলে জিবরিল। হামলায় আহত হয় সে-ও। মাকে হারিয়ে তিন ভাইবোন আবারও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। এখন তিন ভাইবোনের কোনো স্থায়ী আবাস নেই। কখনো তারা থাকে দাদির কাছে, কখনো মায়ের বোনদের তাবুতে। দুই রাত পরপর এক খালার তাবু ছেড়ে অন্য খালার তাবুতে যেতে হয় তাদের।

তাদের খালা ও বিধবা ওয়ারদা আল-মুজেইনি বলেন, শিশুদের কোনো স্থায়ী বাড়ি নেই। তারা মূলত দাদির কাছে থাকে। তবে দুই রাত করে মায়ের বোনদের কাছেও কাটায়। জিবরিলের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বোমা হামলায় আহত হওয়ার পাশাপাশি নিজের চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু দেখেছে সে। এমন অভিজ্ঞতা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তার জন্য কঠিন।

শিশুদের মানসিকভাবে আগলে রাখার পাশাপাশি খাবার, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বজনেরা। ওয়ারদা আল-মুজেইনি নিজেও স্বামীহারা। যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার স্বামী নিহত হন। এখন চার সন্তানকে একাই বড় করছেন তিনি। চাকরি বা নির্ভরযোগ্য আয় না থাকায় নিজের সন্তানদের জন্য দিনে একবেলা খাবার জোগাড় করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই বোনের তিন সন্তানকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে তাকে ও তার অন্য বোনদের।

ওয়ারদা বলেন, তারা নিজেরাই সন্তানদের খাবার জোগাতে সংগ্রাম করছেন। তারপরও বোনের এতিম সন্তানদের একা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই তিন বোন মিলে যতটা সম্ভব দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন। কেউ শিশুদের পোশাক কিনে দেন, কেউ স্যান্ডেল, আবার কেউ কয়েক দিনের হাতখরচ জোগান।

মারিয়াম, আয়া ও জিবরিলের মতো আরও হাজারো শিশু গাজায় মা-বাবাকে হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখে পড়েছে। গাজার সামাজিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ৭১ হাজার শিশু এতিম হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪ হাজার ৪৬৮ শিশু ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর মা-বাবার একজন বা দুজনকেই হারিয়েছে। এ ছাড়া গাজায় অন্তত ৬৪ হাজার নারী স্বামীহারা হয়েছেন। এসব হিসাবের মধ্যে আগের ইসরায়েলি সামরিক অভিযানগুলোতে স্বজন হারানো ব্যক্তিরাও রয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন হাজার শিশুর কোনো নিবন্ধিত অভিভাবক, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা পরিচর্যাকারী নেই।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজিজা আল-খালুত বলেন, পরিসংখ্যান দিয়ে এসব শিশু ও নারীর প্রতিদিনের দুর্ভোগ পুরোপুরি বোঝানো সম্ভব নয়। মা-বাবা দুজনকেই হারানো একটি শিশু শুধু নিরাপত্তা ও পরিচর্যাই হারায় না, তার শিক্ষা ও শৈশবও বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় বয়সের তুলনায় অনেক বেশি দায়িত্ব নিতে হয় তাকে।

তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি, পর্যাপ্ত আশ্রয়ের অভাব এবং পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানোর কারণে গাজায় শিশুদের শ্রমে যুক্ত হওয়া, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া ও অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।

গাজায় এমন শিশুও রয়েছে, যারা পরিবারের সবাইকে হারিয়ে একা বেচে আছে। তাদের একজন ওয়াফা আল-আত্তার। ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দেইর আল-বালাহ এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাঁর বাবা-মা ও চার ভাইবোন নিহত হয়। তখন ওয়াফার বয়স ছিল ১০ বছর। বাবার মুঠোফোনে চার্জ দিতে চাচার বাড়িতে গিয়েছিল ওয়াফা। বাড়িতে ফিরে দেখে, তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। পরে জানতে পারে, পরিবারের কেউ আর বেচে নেই।

ওয়াফা বলেন, মুহূর্তের মধ্যে তিনি পরিবারের সবাইকে হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই শোক মেনে নিতে পারেননি। কখনো কখনো তার মনে হতো, পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে থাকলে হয়তো তিনিও তাদের সঙ্গে মারা যেতেন। পরে চাচা ও তার স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে শুরু করে ওয়াফা। তাদের সহযোগিতায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও নিজের পরিবারের শূন্যতা পূরণ হয়নি।


সূত্র: মিডল ইস্ট আই
  বিষয়:   গাজা  ফিলিস্তিন  এতিম শিশু  ইসরায়েলি হামলা 


আন্তর্জাতিক- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত