ছবি: যাযাদিসুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযান চললেও বিভিন্ন এলাকায় বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনা সামনে আসছে। গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে এ অপরাধের অভিযোগে ৩৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৫ জন। এ সময়ে ৫৯টি বিষের বোতল, বিষ প্রয়োগ করে ধরা ১৬৭ কেজি চিংড়ি ও ১০০ কেজি অন্যান্য মাছ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮৯টি নৌকা ও ৭০টি অবৈধ মাছ ধরার জাল জব্দ করেছে বন বিভাগ।
বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার কারণে সুন্দরবনের মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ও উপকূলের বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকায়। দূষিত মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ঝুকিও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন মার্কি খালে অভিযান চালানো হয়। এ সময় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে চার জেলেকে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে বিষ প্রয়োগ করে ধরা ৮০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়।
এরপর ১৪ অক্টোবর পশ্চিম সুন্দরবনের ভোমরখালী অভয়ারণ্য এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও চার জেলেকে আটক করে বন বিভাগ। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে চার বোতল বিষ, নিষিদ্ধ ভেসালি ও ঘন ফাঁসের চরপাতা জাল, একটি ডিঙি নৌকা, দা, কুড়াল এবং প্রায় ২০০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয় বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ও ফরেস্ট রেঞ্জার আলামিন হোসেন বলেন, অভিযানে বিষ, নিষিদ্ধ জাল এবং মাছ শিকারে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগে ৩৪টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে ৫৯টি বিষের বোতল, বিষ প্রয়োগ করে ধরা ১৬৭ কেজি চিংড়ি এবং ১০০ কেজি অন্যান্য মাছ জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ৮৯টি নৌকা ও ৭০টি অবৈধ মাছ ধরার জাল জব্দ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসেও অভিযানের সময় জেলে আটক এবং বিষ ও মাছ জব্দের ঘটনা ঘটেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর মার্কি খালে চারজন এবং ১৪ অক্টোবর ভোমরখালী অভয়ারণ্য এলাকায় আরও চারজনকে আটকের তথ্য জানিয়েছে বন বিভাগ। সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের বিভিন্ন নদী-খালে ‘রিপকর্ড’ নামের একটি কীটনাশক প্রয়োগ করে চিংড়ি শিকারের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘন ফাসের চরপাতা ও নিষিদ্ধ ভেসালি জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে ছোট মাছ ধরার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ছিচখালি, বুন্দ, কেওড়াসুতি, হংসরাজ, দুধমুখ, দোবেকি, পাটকোষ্টা, চালকি, মার্কি, আন্দারমানিক, শাপখালি, বাটলু, নোটাবেকি ও কাটেশ্বর এলাকার নদী-খালেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পশুর নদী, জয়মনি, কচিখালি, হড্ডা, নীলকমল, বজবজা ও খাসিটানা এলাকাতেও বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব এলাকার সব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ব্যবহৃত রাসায়নিকের ধরন, প্রয়োগের পরিমাণ এবং পানিতে এর প্রভাব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্যও পাওয়া যায়নি।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরলে লক্ষ্যবস্তু মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষাক্ত পদার্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়লে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুকি থাকে। দূষিত মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ব্যবহৃত রাসায়নিকের ধরন ও বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে পানির গুণগত মান, জলজ প্রাণীর বেচে থাকা এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব পড়তে পারে। তবে সুন্দরবনে ব্যবহৃত বিষের রাসায়নিক উপাদান, পানিতে এর স্থায়িত্ব এবং জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাসানুর রহমান বলেন, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ধরনের মাছ শিকারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জেলেদের সচেতন করতে কর্মশালার আয়োজনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
সুন্দরবনের নদী-খালের মাছের ওপর উপকূলের বহু জেলের জীবিকা নির্ভরশীল। বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা মৎস্যসম্পদের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাকেও ঝুকিতে ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বন বিভাগের নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি জব্দ করা রাসায়নিকের পরীক্ষাগারভিত্তিক বিশ্লেষণ, জলজ পরিবেশের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বিষের উৎস শনাক্ত করা, অবৈধভাবে রাসায়নিক সরবরাহের পথ অনুসন্ধান এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।