পৃথিবীর ৯৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর চরম ঝুঁকিতে

মো. শফিউল্লাহ, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি

শিক্ষা

সমুদ্রের নীল পানির নিচে রঙিন প্রবাল, অসংখ্য মাছ ও বিচিত্র সামুদ্রিক প্রাণীর যে জগৎ, তা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়;

2026-10-23T16:30:12+06:00
2026-10-23T16:30:12+06:00
শুক্রবার ● ২৩ অক্টোবর ২০২৬
৭ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
শিক্ষা
পৃথিবীর ৯৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর চরম ঝুঁকিতে
মো. শফিউল্লাহ, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩০ পিএম  
সংগৃহীত ছবি
সমুদ্রের নীল পানির নিচে রঙিন প্রবাল, অসংখ্য মাছ ও বিচিত্র সামুদ্রিক প্রাণীর যে জগৎ, তা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। কিন্তু সেই জীবন্ত জগৎ এখন এমন এক সংকটের মুখে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, পর্যটন ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকায়।

২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) এক বৈশ্বিক মূল্যায়ন বলছে, বিশ্বের ১২৭টি অগভীর পানির প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে ১২২টি। অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী পাঁচ দশকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপীয় চাপ এই বাস্তুতন্ত্রগুলোর জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। খবরটি প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।

তবে এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবাল ইতিমধ্যে মারা গেছে। বরং এর অর্থ, মূল্যায়িত বাস্তুতন্ত্রগুলোর অধিকাংশই এমন ঝুঁকির স্তরে রয়েছে, যেখানে বর্তমান প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেগুলো ধসে পড়তে পারে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংকটের ভয়াবহতা বোঝার পাশাপাশি এখনো যে প্রবালপ্রাচীরগুলো রক্ষা ও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, সেগুলোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ক্ষুদ্র এলাকায় বিশাল জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়

বিশ্বের সমুদ্রতলের তুলনায় প্রবালপ্রাচীরের বিস্তৃতি খুবই সীমিত। কিন্তু এই সীমিত অঞ্চলেই আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক সামুদ্রিক প্রাণী। প্রবালপ্রাচীরকে প্রায়ই ‘সমুদ্রের রেইনফরেস্ট’ বলা হয়, কারণ এর জটিল কাঠামো মাছ, অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের খাদ্য, আশ্রয় ও প্রজননের সুযোগ তৈরি করে।

প্রবালপ্রাচীর উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বহু অঞ্চলে মাছ ধরা, পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসা এই বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি প্রবালের তৈরি প্রাকৃতিক কাঠামো ঢেউয়ের শক্তি কমিয়ে উপকূলীয় ক্ষয় ও ঝড়ের আঘাত থেকে উপকূলকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।

অতএব, প্রবালপ্রাচীরের অবক্ষয় কেবল একটি সামুদ্রিক প্রজাতির ক্ষতি নয়; এটি এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া, যার সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য এবং মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

কেন ধসের মুখে বিশ্বের প্রবালপ্রাচীর?

আইইউসিএনের মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রবালপ্রাচীরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি বাড়ার ফলে প্রবাল স্বাভাবিক পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা হারাচ্ছে।

প্রবালপ্রাচীরের প্রধান নির্মাতা হলো ক্ষুদ্র প্রাণী কোরাল পলিপ। এদের দেহে বসবাসকারী আলোকসংশ্লেষণকারী শৈবাল প্রবালকে খাদ্য ও শক্তি জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পানির তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক সীমার বাইরে বেড়ে গেলে প্রবাল এই শৈবালকে বের করে দিতে পারে। এ ঘটনাকে বলা হয় ‘কোরাল ব্লিচিং’ বা প্রবালের বিবর্ণতা।

ব্লিচিংয়ের সময় প্রবাল সাদা দেখালেও তার মানেই এটি সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছে, এমন নয়। অনুকূল পরিবেশ ফিরে এলে কিছু প্রবাল পুনরুদ্ধার করতে পারে। কিন্তু তাপীয় চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার ব্লিচিং ঘটলে প্রবালের খাদ্যসংস্থান ব্যাহত হয়, রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং মৃত্যুহার বেড়ে যেতে পারে।

সমস্যা হলো, প্রবালপ্রাচীরের পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় সময় অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। একের পর এক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ প্রবালকে নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, ফলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধারক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

৯৬ শতাংশ ঝুঁকির পেছনে কী গবেষণা?

আইইউসিএনের ২২ অক্টোবরের মূল্যায়নটি প্রবালপ্রাচীরের বাস্তুতন্ত্র নিয়ে বৈশ্বিক রেড লিস্ট অব ইকোসিস্টেমস কাঠামোর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক মূল্যায়ন। বিশ্লেষণে অতীতের পরিবেশগত পরিবর্তনের তথ্যের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতির পূর্বাভাস বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

মূল্যায়নে ব্যবহৃত মধ্যমপন্থী জলবায়ু পরিস্থিতি অনুযায়ী, শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় ২১০০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সালের সম্ভাব্য তাপীয় চাপ বিশ্লেষণ করে ১২১টি প্রবালপ্রাচীর অঞ্চলকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। অতীতের ক্ষয়ক্ষতির অন্যান্য সূচকসহ সামগ্রিক মূল্যায়নে ১২২টি অঞ্চল ‘ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড’ বা সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এখানে ‘ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড’ বলতে প্রজাতির বিলুপ্তি নয়, বরং বাস্তুতন্ত্রের ধসে পড়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি বোঝানো হয়েছে। গবেষকেরা অতীতের প্রায় ৫০ বছরের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ তাপীয় চাপ—দুই ধরনের তথ্যই বিবেচনা করেছেন। শুধু অতীতের পরিবর্তন বিবেচনায় নিলে ১২৭টি অঞ্চলের মধ্যে ৩০টি, অর্থাৎ প্রায় ২৪ শতাংশ, এই সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে পড়ত। ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতির পূর্বাভাস যুক্ত হওয়ায় ঝুঁকির চিত্র আরও গুরুতর হয়েছে।

এই ফলাফল তাই শুধু বর্তমান অবক্ষয়ের হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে, সে বিষয়ে একটি সতর্কবার্তাও। তবে জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাস সম্ভাব্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। একে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, স্থানীয় চাপও বড় সমস্যা

প্রবালপ্রাচীরের সংকটকে শুধু সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। অতিরিক্ত মাছ আহরণ, উপকূলীয় উন্নয়ন, দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং ঝড়ের মতো বিষয়ও প্রবালপ্রাচীরের ওপর চাপ তৈরি করে।

আইইউসিএনের বাস্তুতন্ত্র মূল্যায়নে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর অঞ্চলে মাছ ও অন্যান্য জীবের পারস্পরিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার চাপ রয়েছে। কিছু অঞ্চলে প্যারটফিশ ও গ্রুপারের মতো মাছ অতিরিক্ত আহরণ করার ফলে প্রবালপ্রাচীরের ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

বিশেষত প্যারটফিশ অনেক প্রবালপ্রাচীরে শৈবাল খেয়ে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এসব মাছের সংখ্যা কমে গেলে শৈবাল বিস্তার লাভ করতে পারে এবং নতুন প্রবালের বসতি স্থাপনের উপযোগী স্থান কমে যেতে পারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবালপ্রাচীরের পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

উপকূলীয় নির্মাণকাজ থেকে পলি ও দূষিত পদার্থ পানিতে মিশলে প্রবালের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কৃষি ও নগর এলাকার পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন এবং পর্যটন-সম্পর্কিত ক্ষতিও স্থানীয় পর্যায়ে প্রবালের স্বাস্থ্য দুর্বল করতে পারে।

অর্থাৎ, বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানো যেমন অপরিহার্য, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ ও আবাসস্থল ধ্বংস নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

  বিষয়:   নোবিপ্রবি  পৃথিবী  প্রবালপ্রাচীর 


শিক্ষা- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত