সংগৃহীত ছবিফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে আলোচনায় এসেছে অদ্ভুত এক স্লোগান, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্রণে তৈরি এই বাক্যাংশের সরল অর্থ স্পষ্ট নয়। তবে তরুণদের মধ্যে এটি পুলিশি নজরদারি, কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস ও বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে ব্যঙ্গ করার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, স্লোগানটির সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ন্যাপচ্যাটে। পরে এর স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভকারীরা বাক্যাংশটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের ধারণা, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অনলাইন আলোচনায় প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে গিয়ে কেউ এই বার্তা দিয়েছিলেন।
‘বিসমিল্লাহ’ আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। অন্যদিকে ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’ (C’est les ténèbres) আক্ষরিকভাবে ‘এটি অন্ধকার’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। দুটি ভাষার এই অস্বাভাবিক মিশ্রণ তরুণদের কাছে হাস্যরসের বিষয় হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের আয়োজকেরা স্ন্যাপচ্যাটের একটি ব্যক্তিগত চ্যাটরুমে আলোচনা করতেন। সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে এক ব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ লিখে বার্তা পাঠান। এরপর তিনি লেখেন, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।’
ধারণা করা হয়, ভিন্ন ভিন্ন প্রোফাইল ব্যবহার করে একই ধরনের বার্তা একাধিকবার পাঠানো হয়েছিল। কয়েকটি প্রোফাইলে মামাদু ও আবদেল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি দেখা যায়। অন্য ব্যবহারকারীরা বার্তাগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস নিশ্চিত করা যায়নি।
অনেক তরুণের ধারণা, এসব বার্তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢুকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁদের মতে, বার্তাগুলো পুলিশের নজরদারি এবং আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের পূর্বধারণাকে ব্যঙ্গ করার সুযোগ তৈরি করেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বাক্যাংশ কোনো মন্ত্রণালয়কর্মী ব্যবহার করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা কখনো কখনো অনলাইনে ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করেন। এভাবে সংগৃহীত তথ্য তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় কাজে লাগতে পারে।
শিক্ষার্থীদের কাছে স্লোগানটি সরকার ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দূরত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকার তাঁদের দাবিগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। একই সঙ্গে পুলিশের নজরদারি ও আন্দোলনে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাকে বিদ্রূপ করতেও তাঁরা এটি ব্যবহার করছেন।
ফ্রান্সের একটি প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের মুখপাত্র সাবরিন খারবাখ বলেন, ‘কোনো তরুণ এভাবে কথা বলে না।’ তাঁর মতে, তরুণেরা স্লোগানটির মাধ্যমে নজরদারির চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করছেন এবং বোঝাচ্ছেন যে এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁরা সংগঠিত হতে সক্ষম।
বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদিওর মতে, স্ন্যাপচ্যাটের বার্তাগুলোতে পুলিশের এক ধরনের পূর্বধারণা প্রকাশ পেয়েছে। পুলিশ ধরে নিয়েছিল, নির্দিষ্ট কিছু মানুষ অবরোধ তৈরি করছেন বা ভাঙচুরের পরিকল্পনা করছেন।
প্যারিসের শিক্ষার্থী ফেদ্র কেমেনের বলেন, বাক্যাংশটি ফ্রান্সজুড়ে রসিকতার বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, এতে তরুণদের কথা বলার ধরন অনুকরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা অস্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, স্লোগানটিকে বর্ণবাদের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে ভাঙচুরের সঙ্গে আরব বংশোদ্ভূত মানুষেরা জড়িত।
ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের সন্তান, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ তাঁদের ভুল বোঝে এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আলোচিত স্লোগানটি ঘিরে বিতর্কেও সেই অসন্তোষের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি বেলজিয়াম ও জার্মানির একই ধরনের বিক্ষোভেও ব্যবহার করা হয়েছে। সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রকাশিত একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে স্লোগানটি বলেন। ভিডিওতে তাঁকে তরুণদের ব্যবহৃত আরও কিছু অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায়। এর মধ্যে ‘৬-৭’ নামের একটি মিমের সঙ্গে সম্পর্কিত অঙ্গভঙ্গিও ছিল।
স্লোগানটির ব্যবহার ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলনের’ কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। সেখানে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভারতের প্রধান বিচারপতির তরুণ ও বেকারদের ‘পরজীবী’ ও ‘ককরোচ’ বলার প্রতিবাদে অপমানসূচক শব্দটিকেই নিজেদের আন্দোলনের নাম হিসেবে গ্রহণ করেন।
ফ্রান্সে গত মাসে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার, আরও শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং ব্যস্ততাপূর্ণ সময়সূচি সহজ করার দাবিতে তাঁরা আন্দোলনে নামেন।
বেশিরভাগ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা অন্তত ২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেন বা ভাঙচুর চালান। এসব ঘটনায় প্রায় আট হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য সংগঠনের কর্মসূচি যুক্ত হয়। এতে গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তবে দাঙ্গা ও সহিংসতার কারণে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো আড়ালে চলে যায়।
বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অন্তত ৩৪টি অভিযোগ তদন্ত করছে ফ্রান্সের সরকারি পুলিশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা। পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড কাছ থেকে আঘাত করায় কিশোরটি গুরুতর আহত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি একটি অস্বাভাবিক অনলাইন বার্তা থেকে তরুণদের প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়েছে। এর ব্যবহার ঘিরে হাস্যরসের পাশাপাশি পুলিশি নজরদারি, বর্ণবৈষম্য ও কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাসের প্রশ্নও সামনে এসেছে।