চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে, তিন বছরে ৫৪ বাংলাদেশির মৃত্যু

যাযাদি অনলাইন

সারাদেশ

পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে ভালো বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। তাদের অনেকের মরদেহ দেশে ফিরছে না, মৃত্যুর

2026-10-21T11:48:50+06:00
2026-10-21T11:48:50+06:00
বুধবার ● ২১ অক্টোবর ২০২৬
৫ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
সারাদেশ
চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে, তিন বছরে ৫৪ বাংলাদেশির মৃত্যু
যাযাদি অনলাইন
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৮ এএম  
ছবি: সংগৃহীত
পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে ভালো বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। তাদের অনেকের মরদেহ দেশে ফিরছে না, মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট প্রমাণও পাচ্ছে না পরিবার। ফলে নিখোজ স্বজনের অপেক্ষায় দিন কাটছে স্বজনদের, মিলছে না ক্ষতিপূরণও। গত তিন বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত ৫৪ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়ে নির্মাণশ্রমিকের কাজের প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন।

লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুন তাদেরই একজন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ফেরানোর আশায় রাশিয়ায় গেলেও শেষ পর্যন্ত তার ঠাই হয় যুদ্ধের ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধে পাঠানোর আগের দিন দেশে থাকা ছোট ভাই মো. রনিকে ফোন করে মামুন বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে পাঠিয়ে দিচ্ছে, আর দেখা না-ও হতে পারে। দুনিয়ায় দেখা না হলে দেখা হবে হাশরের মাঠে।’

মামুনের বাবা আবদুল মজিদ বলেন, যুদ্ধে নেওয়ার পর থেকে ছেলের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। পরে রাশিয়ায় মামুনের সঙ্গে যাওয়া আল আমিনকে ফোন করলে তিনি জানান, মামুন মারা গেছেন। এরপর গ্রামে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়। তবে মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ না থাকায় উপস্থিত লোকজন জানাজা না পড়ে মোনাজাত করেন।

এরই মধ্যে পাচ মাস পার হয়েছে। ঋণগ্রস্ত পরিবারটি এখন অসহায়। এক বছরের ছেলেকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে মামুনের স্ত্রীর।

গত ৭ মে ঢাকা থেকে আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বলে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। কিন্তু রাশিয়ায় পৌছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে তাদের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ১৬, ৮ ও ৬ জনের দলে ভাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তাদের অনেকেই ১২ ও ১৩ জুনের দিকে মারা যান বলে জানা গেছে। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পালিয়ে দেশে ফেরেন দুজন। তারা হলেন নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেন ও ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। তাদের কাছ থেকে অন্য বাংলাদেশিদের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে প্রথম আলো।

আদনান বলেন, রাশিয়া যুদ্ধে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে না এবং মরদেহও দেশে পাঠায় না। যুদ্ধের সম্মুখসারি থেকে কেউ ফিরে না এলে তাকে নিখোজ বলা হয়। তার ভাষ্য, নিখোজ হওয়ার অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যু।

যুদ্ধক্ষেত্রে পেটে স্প্লিন্টারের আঘাত নিয়ে মস্কোর একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আদনান। তার তিন দফা অস্ত্রোপচার হয়। দেড় মাস বিছানা থেকে উঠতে পারেননি। টানা দুই মাস হাসপাতালে থাকার পর সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। পরে ট্রাভেল পাস নিয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।

রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস বিভিন্ন সময়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। গত ২৫ মে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দূতাবাসের শ্রম উইং থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সি জাবালে নূর ৫ মে ৭০ জন কর্মী পাঠানোর অনুমতি চাইলেও দূতাবাস তাদের কাগজপত্র সত্যায়ন করেনি। প্রাথমিকভাবে আর এস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ১০ জন কর্মী পাঠানোর কথা বলা হলেও সন্দেহ তৈরি হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়।

এরপর ১৮ মে এক কর্মীর পরিবারের পক্ষ থেকে দূতাবাসে ফোন করে জানানো হয়, জাবালে নূর ও আর এস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় গেছেন এবং তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, জাবালে নূর ও আর এস ইন্টারন্যাশনাল সত্যায়ন করাতে না পারায় টিএস ওভারসিজের নামে কর্মীদের পাঠানো হয়েছে। দূতাবাসের অনুমতি ছাড়া কর্মী পাঠানোর বিষয়টি যাচাই করতে বলা হয়। পাশাপাশি কর্মীদের যুদ্ধক্ষেত্রে না পাঠিয়ে নিয়োগপত্র অনুযায়ী কাজে ফিরিয়ে আনতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত চার-পাচ মাস ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোজ ও নিহত বাংলাদেশিদের বিষয়ে রাশিয়া সরকার দূতাবাসকে তথ্য দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৪০ জনের তথ্য জানানো হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে কতজন নিহত এবং কতজন নিখোজ, তা আলাদা করে জানানো হয়নি। সর্বশেষ আরও ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

যুদ্ধে কেউ মারা গেলে অথবা ছয় মাসের বেশি সময় নিখোজ থাকলে ক্ষতিপূরণ দাবির সুযোগ রয়েছে। তবে রাশিয়া থেকে ক্ষতিপূরণ পেতে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা এবং উত্তরাধিকারীদের রাশিয়ায় গিয়ে অন্তত ছয় মাস অবস্থান করাসহ জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মরদেহ উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে নিয়মিত আলোচনা চলছে।

রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী নিজেরাই যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সর্বশেষ ৩০ জনের ক্ষেত্রেও রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে গিয়েছেন। এ বিষয়ে লিখিত প্রমাণ রাশিয়ার কাছে রয়েছে। তবে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ মরদেহ হস্তান্তর করছে না বলে তা দেশে পাঠানো যাচ্ছে না।

ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডস নামের দুটি সংগঠন গত মার্চে জানায়, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে তখন পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। গত ১৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি জানায়, ৩০ জন বাংলাদেশিকে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে জুনে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। তাদের অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

তাদের ভাষ্য, জুনে যুদ্ধে পাঠানোর আগে কর্মীরা পরিবারের কাছে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকেই কর্মীরা নিখোজ হতে থাকেন। মৃত্যুর খবর পেলেও পরিবারগুলো কোনো প্রমাণ পায়নি। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বিদেশিদের মরদেহ উদ্ধার না করে মাঠেই ফেলে রাখা হয়।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে কোনো কর্মী মারা গেলে তার মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব নেয় বোর্ড। এ জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করতে হয়। কর্মী বাংলাদেশ থেকে বিএমইটি ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গেলে অথবা বিদেশে যাওয়ার পর দূতাবাসে সদস্যপদ নিবন্ধন করলে মরদেহ আনার খরচ বহন করে কল্যাণ বোর্ড।

এই শর্তগুলোর কোনোটিই পূরণ না হলেও পরিবার বোর্ডে আবেদন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বোর্ড প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। মন্ত্রণালয় থেকে মরদেহ দেশে আনার খরচ দেওয়া হয়, যার জন্য প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ থাকে।

দেশে আনা প্রতিটি মরদেহ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এরপর পরিবারকে তিন লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এর বাইরে রয়েছে জীবনবিমার সুবিধা। বিদেশে কোনো ক্ষতিপূরণ পাওনা থাকলে দূতাবাসের মাধ্যমে তা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মৃত কর্মীর বকেয়া পাওনা আদায়েও দূতাবাস সহায়তা করে।

তবে রাশিয়া থেকে মরদেহ আনার জন্য এখন পর্যন্ত কল্যাণ বোর্ডে কোনো আবেদন জমা পড়েনি। মৃত্যুর প্রমাণ না থাকায় পরিবারগুলো আবেদন করতে পারছে না। ফলে ক্ষতিপূরণও পাচ্ছে না। এসআরবি, গোয়েন্দা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক সামর্থ্য, প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত দক্ষতা নেই। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে এসব কর্মীকে সামনে পাঠিয়ে একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রতিপক্ষ ড্রোন হামলা চালালে রুশ সেনারা সেই হামলার সূত্র ধরে শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসআরবিও এমন তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে। সুযোগ পেয়ে কেউ কেউ জীবন বাচাতে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন।

এসআরবি জানায়, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। রাশিয়ায় পৌছানোর পর তাদের প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে ১৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৩০ জনের ওই দলের একজন মো. পলাশ শেখ। যুদ্ধে গিয়ে প্রথম দফায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। সুস্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধে গিয়ে হাত হারান। বর্তমানে মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম বলেন, চাকরির প্রলোভনে পলাশ প্রতারিত হয়েছেন। ২২ দিন ধরে তিনি হাসপাতালে ভর্তি। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেও সহায়তা পাওয়া যায়নি। সেনা পাহারা থাকায় হাসপাতাল থেকে পালাতেও পারছেন না তিনি। পলাশকে রাশিয়ায় পাঠাতে পরিবার ১০ লাখ টাকা খরচ করলেও কোনো অর্থ ফেরত পায়নি।

নিখোজ স্বজনদের ফিরিয়ে আনতে গত জুলাইয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আলাদাভাবে জমা দেওয়া ২৮টি চিঠি এসেছে। চিঠিগুলোতে বলা হয়, উন্নত জীবনের আশায় কর্মসংস্থানের জন্য দালালের মাধ্যমে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তারা। খিলক্ষেতের জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল ও আশুলিয়ার আর এস ইন্টারন্যাশনাল তাদের রাশিয়ায় পাঠায়। উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। চিঠিতে নিখোজ স্বজনদের দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক সহায়তার আবেদন জানানো হয়।

ঝিনাইদহের ২১ বছর বয়সী রাজন হোসেন গত ৭ মে ৩০ জনের দলের সঙ্গে রাশিয়ায় যান। উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় দালালকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। তবে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। চার দিন হোটেলে রাখার পর একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে সেনাক্যাম্পে পাঠানো হয়।

রাজন বলেন, ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে আরও পাচ বাংলাদেশির সঙ্গে তাকেও যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে ড্রোন হামলায় চারজন মারা যান। তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এই সুযোগে একটি চক্র চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কর্মীদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দেশে ফিরছেন, কেউ মারা যাচ্ছেন, আবার কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন। তবু রাশিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা কমেনি।

রাশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা এবং মাসে তিন থেকে চার লাখ টাকা বেতনের আশাও অনেককে যুদ্ধে যেতে প্রলুব্ধ করছে। ছয় মাস যুদ্ধে থাকলে নাগরিকত্বের সুযোগ পাওয়া যায় বলে প্রচার রয়েছে। কেউ কেউ নিজ উদ্যোগেও যুদ্ধে যাচ্ছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাশিয়া যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছিলেন মাত্র ৩৭ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ১ হাজার ৩৯৫ জনে। ২০২৫ সালে ছাড়পত্র নেন ৪ হাজার ৭২৫ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাশিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্রের সংখ্যা তিন গুণের বেশি হয়। চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ১০৫ জন।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, মানব পাচারে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠাচ্ছে রাশিয়ায়। কতজন সেখানে গিয়ে কাজ পেয়েছেন, আর বাকিরা কোথায় আছেন, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। পরিবারগুলো মরদেহ ও ক্ষতিপূরণ কোনোটিই পাচ্ছে না। কতজন মারা গেছেন, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না। নিখোজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির জন্য হটলাইন চালুর পরামর্শ দেন তিনি।

গত চার বছরে রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৯৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। এসআরবির অভিযুক্ত তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টিএস ওভারসিজ ২৬৬ জনের নামে ছাড়পত্র নিয়েছে। অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম বিএমইটির ডেটাবেজে পাওয়া যায়নি।

রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ছাড়পত্র নিয়েছে বন্যা বিজয় ওভারসিজ। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় আড়াই হাজার কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র নিয়েছে, যা মোট কর্মীর প্রায় ২৭ শতাংশ। এজেন্সিটির বিরুদ্ধে আলজেরিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে মানব পাচারের অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রেও অভিযোগ উঠেছে। ১৭টি এজেন্সি শতাধিক কর্মীর ছাড়পত্র নিয়েছে।

৩০ কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত জাবালে নূর, টিএস ওভারসিজ ও আরএস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠানো বন্যা বিজয় ওভারসিজের সার্ভার লক করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে ছাড়পত্র নিতে পারছে না। এসব এজেন্সি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই রিক্রুটিং ব্যবসায় যুক্ত ছিল।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৭১ জন কর্মীর ছাড়পত্র নিয়েছে সরকারি এজেন্সি বোয়েসেল। প্রতিষ্ঠানটির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, তারা রাশিয়ার তিনটি কোম্পানিতে কর্মী পাঠাচ্ছিলেন। এর মধ্যে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। একজন কর্মী গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান, আরেকজন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এরপর দুটি কোম্পানি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। অন্য একটি কোম্পানিতে এখনো কর্মী যাচ্ছেন। পুরোনো চাহিদাপত্র অনুযায়ী আরও ১৪ জনের রাশিয়া যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে গত এক বছরে বোয়েসেল নতুন কোনো চাহিদাপত্র পায়নি।

রাশিয়ায় শ্রম অভিবাসন নিয়ে গত বছরের নভেম্বরে একটি গবেষণা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচি। গবেষণায় উঠে আসে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোট কতজন বাংলাদেশি জড়িয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন কিংবা কতজন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে আছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই।

প্রতারণার প্রক্রিয়া শুরু হয় বাংলাদেশ থেকেই। কর্মীরা বৈধ ভিসা, চাকরির চুক্তি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েই দেশ ছাড়েন। কিন্তু রাশিয়ায় পৌছানোর পর তাদের যুদ্ধে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। রাশিয়ায় বাংলাদেশিদের পাচারের অভিযোগে অন্তত ছয়টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্র।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, কর্মীদের এভাবে রাশিয়ায় যেতে নিরুৎসাহিত করছে সরকার। নিশ্চিত চাকরির তথ্য যাচাই-বাছাই ও সত্যায়ন না করে কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। অনেকে বিভিন্ন দেশ হয়ে নানা উপায়ে রাশিয়ায় যাচ্ছেন। সব দূতাবাসকে সতর্ক করা হয়েছে এবং প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নজরদারি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, যারা মারা গেছেন বলে তাদের পরিবার খবর পেয়েছে, তাদের মরদেহ খুজে বের করা কঠিন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাশিয়ায় চাকরির আশায় যাওয়া বাংলাদেশিদের নিখোজ হওয়া, মৃত্যুর খবর পাওয়া এবং মরদেহ দেশে ফেরত না আসার ঘটনা একদিকে পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে, অন্যদিকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া ও নিয়োগের প্রতিশ্রুতি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনছে। মৃত্যুর প্রমাণ ও মরদেহ না থাকায় পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণের আবেদনও করতে পারছে না।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো
  বিষয়:   রাশিয়া  ইউক্রেন  যুদ্ধ  বাংলাদেশি কর্মী  মানব পাচার 


সারাদেশ- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত