ছবি: রয়াটার্স ফ্রান্সজুড়ে সহিংস বিক্ষোভের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী রাজনীতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন, আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং সমতা প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুত রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
গত রোববার রাতে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ স্বীকার করার পাশাপাশি বিক্ষোভের সময় সহিংসতা ও ভাঙচুরের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যারা সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ধ্বংস করেছে, তাদের এর মূল্য দিতে হবে। যারা লুটপাট করেছে, তাদের ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের চেষ্টা করা ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
তবে ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীদের অনেকে। প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শহরতলি ইভরি-সুর-সেনের ২০ বছর বয়সী ইয়ানিস বলেন, প্রেসিডেন্ট তাঁর পরিচিত ‘ব্লা ব্লা ব্লা’ বক্তব্য দিয়েছেন, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলেননি। পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহান্তে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উন্নত বিদ্যালয়, আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। তবে সময়ের সঙ্গে আন্দোলন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।
২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই অস্থিরতা ফ্রান্সের রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাজপথের ক্ষোভকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। ম্যাক্রোঁ দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফরাসি সংবিধান অনুযায়ী, তিনি পরবর্তী নির্বাচনে আবার প্রার্থী হতে পারবেন না।
বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলশো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তার দল ফ্রান্স আনবোড বা এলএফআই সামাজিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনাকে সামনে আনছে। অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন ল্য পেন বিক্ষোভের সময় সহিংসতা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মধ্যপন্থী প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু অভিযোগ করেছেন, কট্টর বামপন্থীরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে সহিংসতাকে একধরনের ‘প্রস্তুতিমূলক পর্ব’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইউপিইসি-প্যারিস ১২ বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি আইনের অধ্যাপক বেলিগ নবলি বলেন, প্রার্থীদের তরুণদের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। তার মতে, তরুণদের দাবির জবাব দেওয়ার রাজনৈতিক দায়িত্ব প্রার্থীদের রয়েছে। সেই বার্তা শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, এতে তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন থাকতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে মেরিন ল্য পেন এগিয়ে রয়েছেন। জরিপে তার সমর্থন ৩২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যেও তার দল ন্যাশনাল র্যালি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যদিও এই বয়সী ভোটারদের মধ্যে ফ্রান্স আনবোড এগিয়ে।
রোববার রাতে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ল্য পেন বলেন, ফ্রান্সের শহর, রাস্তাঘাট ও দেশকে ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হতে দেখা গেছে। তিনি দেশটিতে আস্থা ও কর্তৃত্বের গভীর সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।
তার অভিযোগ, ফ্রান্স সহিংসতা ও সরকারের অক্ষমতার মধ্যে আটকে পড়েছে। এ বক্তব্যের মাধ্যমে ল্য পেন বিক্ষোভকে আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছেন।
ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই সামাজিক আন্দোলন তার সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে। তার শাসনামলের প্রথম দিকে জ্বালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ধনীদের প্রতি সরকারের পক্ষপাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হয়।
বর্তমান বিক্ষোভের সঙ্গে সেই আন্দোলনের কিছু মিল থাকলেও এবার নতুন সরকারের জন্য অর্থনৈতিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হতে পারে। গত বছর ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ দশমিক এক শতাংশে দাড়ায়, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিন দশমিক এক শতাংশ গড়ের চেয়ে বেশি।
এ পরিস্থিতিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে সরকারি ব্যয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা এবং জনঅসন্তোষ বাড়ার ঝুকির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। সামাজিক অস্থিরতা কমাতে অতিরিক্ত সরকারি সহায়তা দেওয়ার সুযোগও আগের তুলনায় সীমিত হতে পারে।
বর্তমান আন্দোলন ফ্রান্সের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাকে আরও সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তার হার ১৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তার সর্বনিম্ন পর্যায়।
রোববারের ভাষণে ম্যাক্রোঁ সহিংসতার জন্য প্রান্তিক কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেন। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে তিনি সংক্ষেপে কথা বলেন এবং সেগুলো বাস্তবায়নে নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ ঘোষণা করেননি।
এর পরিবর্তে তিনি প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী দিনগুলোতে প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেন। একই সঙ্গে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
এই পরিস্থিতি ম্যাক্রোঁর বিরোধীদের জন্য তার শাসনামলে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও সামাজিক অসন্তোষের সমাধান না হওয়ার অভিযোগ তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে তরুণ ভোটারদের সমর্থন আদায়ে বাম, ডান ও মধ্যপন্থী সব শিবিরই সক্রিয় হতে পারে।
ফ্রান্সের রাজনীতিতে এখন বড় প্রশ্ন, তরুণদের ক্ষোভ ও পরিবর্তনের দাবি কোন রাজনৈতিক শক্তিকে এগিয়ে দেবে। তবে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সেই পরিবর্তন কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে দেশটিতে এখনো ঐকমত্য নেই।