১৫ লাখ দর্শকের সামনে গিটার বাজানোর স্বপ্ন দেখতেন আইয়ুব বাচ্চু

যাযাদি অনলাইন

বিনোদন

একদিন ১৫ লাখ মানুষের সামনে গিটার হাতে দাড়াবেন আইয়ুব বাচ্চু। দেশি-বিদেশি খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীরা থাকবেন একই মঞ্চে। একের পর এক গানে

2026-10-18T21:17:11+06:00
2026-10-18T21:17:11+06:00
সোমবার ● ১৯ অক্টোবর ২০২৬
৩ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
বিনোদন
১৫ লাখ দর্শকের সামনে গিটার বাজানোর স্বপ্ন দেখতেন আইয়ুব বাচ্চু
যাযাদি অনলাইন
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:১৭ পিএম  
ছবি: সংগৃহীত
একদিন ১৫ লাখ মানুষের সামনে গিটার হাতে দাড়াবেন আইয়ুব বাচ্চু। দেশি-বিদেশি খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীরা থাকবেন একই মঞ্চে। একের পর এক গানে আর গিটারের সুরে মুখর হয়ে উঠবে ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি এই শিল্পী এমনই এক বিশাল কনসার্ট আয়োজনের স্বপ্ন দেখতেন। নতুন প্রজন্মের গিটারবাদকদের নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং একটি গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু স্বপ্নগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তার আকস্মিক মৃত্যুতে থেমে যায় সেই পথচলা। পেরিয়ে গেছে আট বছর, অপূর্ণ রয়ে গেছে তার অনেক আকাঙ্ক্ষা।

আইয়ুব বাচ্চু শুধু নিজের সংগীতজীবন নিয়েই ভাবতেন না, নতুন শিল্পীদের জন্যও কিছু করতে চাইতেন। তার কাছে গিটার ছিল কেবল বাদ্যযন্ত্র নয়, নিজের অনুভূতি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। গিটার হাতে মঞ্চে উঠে সুরের জাদুতে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন তিনি। দেশ-বিদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে পরিচিতি পেয়েছিলেন গিটার জাদুকর হিসেবে। নিজের সংগীতচর্চার পাশাপাশি নতুন গিটারবাদক তৈরির ভাবনাও ছিল তার।

নবীন গিটারবাদকদের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। বিজয়ীদের নিজের সংগ্রহের গিটার উপহার দিতে চেয়েছিলেন তিনি। যেসব গিটার হাতে নিয়ে বছরের পর বছর মঞ্চ মাতিয়েছেন, সেগুলোই নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় উদ্যোগটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।

একটি গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও ছিল তার। সেখানে গিটারের পাশাপাশি অন্য বাদ্যযন্ত্র শেখানোর ব্যবস্থাও রাখতে চেয়েছিলেন। নতুনেরা যেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাদ্যযন্ত্র শেখার সুযোগ পান, দক্ষতা বাড়াতে পারেন এবং সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারেন, এমন পরিবেশ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর।

আইয়ুব বাচ্চু বেচে থাকলে হয়তো সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও উদ্যোগী হতেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তরুণদের শেখাতেন গিটার বাজানোর কৌশল, নিয়মিত অনুশীলনের গুরুত্ব এবং সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা। তার তত্ত্বাবধানে নতুন একদল গিটারবাদক গড়ে উঠতে পারত। তবে এসবই সম্ভাবনার কথা। তার স্বপ্ন বাস্তবে কত দূর এগোত, তা আর জানা সম্ভব নয়।

মঞ্চে আইয়ুব বাচ্চুর উপস্থিতি ছিল স্বতন্ত্র। গানের পাশাপাশি গিটারবাদনে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন তিনি। কখনো গিটারের তারে তুলতেন ঝড়, কখনো দীর্ঘ একক পরিবেশনায় শ্রোতাদের নিয়ে যেতেন অন্য এক সংগীতজগতে।

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এক আড্ডায় নিজের স্বপ্নের কনসার্টের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল এক কনসার্ট আয়োজন করতে চেয়েছিলেন তিনি। সেখানে দেশি-বিদেশি শিল্পীরা একই মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করবেন, এমনটাই ছিল তার পরিকল্পনা।

বিদেশি শিল্পীদের তালিকায় তার পছন্দের মধ্যে ছিলেন মার্কিন গায়ক ও গিটারবাদক স্টিভ ভাই, জো সাত্রানি ও কার্লোস সান্টানা। ব্রিটিশ ড্রামার আয়েন পেজের কথাও বলেছিলেন তিনি। দেশীয় শিল্পীদের মধ্যে রাখতে চেয়েছিলেন জেমস, বেজবাবা সুমন ও মানাম আহমেদকে।

স্বপ্নের আয়োজন নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘আমরা একটা স্লট বাজাব, ঘণ্টা তিনেক ধরে। আর দর্শক থাকবে ১৫ লাখ। তাহলে সেটা হবে স্বপ্নের কনসার্ট।’

তার কল্পনায় ছিল বিশাল এক মঞ্চ, অসংখ্য দর্শক আর গিটারের সুরে মুখর একটি সন্ধ্যা। কিন্তু সেই কনসার্ট আর আয়োজন করা হয়নি। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ১৫ লাখ দর্শকের সামনে গিটার বাজানোর স্বপ্নটি আজও অপূর্ণ।

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর গভীর টান। বাবার কাছ থেকে প্রথম গিটার পাওয়ার পর শুরু হয় অনুশীলন। বিটিভিতে নয়ন মুন্সীর গিটার বাজানো দেখে তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। পরে নিজেই গিটার শেখার চর্চা শুরু করেন। একাগ্রতা ও দীর্ঘদিনের সাধনায় হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের স্বতন্ত্র ধারার একজন গিটারবাদক।

সংগীতজীবনের শুরুতে বিভিন্ন ব্যান্ডে বাজিয়েছেন তিনি। পরে যুক্ত হন ‘সোলস’ ব্যান্ডে। সেখানে কাজ করতে করতেই গিটারবাদক, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। এরপর ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, সংক্ষেপে এলআরবি। পরে নামটির পূর্ণরূপ হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’। এলআরবির সঙ্গে তাঁর পথচলা বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

‘সেই তুমি’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘রুপালি গিটার’, ‘ফেরারি মন’ ও ‘এখন অনেক রাত’-এর মতো গান আজও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। তাঁর গিটারবাদনে ছিল রকসংগীতের তীব্রতা, ব্লুজের বিষণ্নতা ও মেলোডির মায়া। গিটারকে শুধু গানের সংগত হিসেবে নয়, নিজস্ব ভাষায় অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি।

আইয়ুব বাচ্চুর গান একটি প্রজন্মের আবেগ ও ভালোবাসার অংশ হয়ে আছে। নতুন প্রজন্মও তার গান শুনছে, গাইছে এবং নিজেদের মতো করে সংগীতের নানা নিরীক্ষায় ব্যবহার করছে। তিনি বেচে থাকলে তরুণদের সঙ্গে কাজ করার, নতুন শিল্পীদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার এবং সংগীতের নতুন ধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারতেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও নতুনদের নিরীক্ষা থেকে তৈরি হতে পারত ভিন্ন স্বাদের সংগীত।

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তার সংগৃহীত গিটারগুলো নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। প্রতিটি গিটারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার সংগীতজীবনের কোনো না কোনো অধ্যায়। কোনোটি মঞ্চে বাজিয়েছেন, কোনোটি দিয়ে তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় গানের সুর, আবার কোনোটি ছিল তার ব্যক্তিগত সংগ্রহের অংশ।

গিটারগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি সেগুলোকে ঘিরে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। তার ব্যবহৃত গিটার নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে জানতে পারবে। তার গিটার, গানের পাণ্ডুলিপি, ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতজীবনের স্মারক নিয়ে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে।

একই সঙ্গে তার গান, গিটারবাদনের ভিডিও, সাক্ষাৎকার ও সংগীতচর্চার দলিল নিয়ে সমৃদ্ধ ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

আইয়ুব বাচ্চুর ২৭২টি গান সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ ও ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছিল প্রথম আলোর প্রতিবেদনে। এ ধরনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, যাতে তার সৃষ্টিগুলো সহজে খুজে পাওয়া যায় এবং নতুন প্রজন্ম সেগুলো থেকে শিখতে পারে। শুধু স্মরণসভা বা মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন নয়, তার সংগীত ও সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর আট বছর পরও সংগীতাঙ্গনে তাকে নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। বিভিন্ন মঞ্চে তার গান পরিবেশন করছেন শিল্পীরা। সংগীতশিল্পী ও অনুরাগীরা তার গান থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন।

সংগীতশিল্পী শুভ একবার প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে তার ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল। মৃত্যুর পাচ দিন আগে বিমানবন্দরে দেখা হলেও সেই ভুল-বোঝাবুঝি দূর করতে পারেননি। এ নিয়ে তার আক্ষেপ রয়ে গেছে। শুভর ভাষায়, ‘আমার পুরো সংগীতজীবনে তার একটা বিরাট প্রভাব আছে। তার একটা কথা শুনলেই আশীর্বাদের মতো মনে হতো।’

২০২৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। তার স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘বাচ্চু থাকলে বেশি খুশি হতো। পুরস্কারটা নিজে হাতে নিতে পারলে খুশি হতো।’

আজ আইয়ুব বাচ্চু বেচে থাকলে হয়তো একুশে পদক হাতে নিয়ে হাসতেন, নতুন কোনো গানের পরিকল্পনা করতেন কিংবা আবারও বলতেন ১৫ লাখ দর্শকের সামনে কনসার্ট আয়োজনের কথা। হয়তো তার স্বপ্নের গিটার স্কুলে কোনো কিশোর প্রথমবারের মতো গিটারের তারে হাত রাখত। তার সংগ্রহের কোনো গিটার উঠে আসত তরুণ শিল্পীর হাতে। কিংবা নতুন প্রজন্মের কারও সঙ্গে মঞ্চে দাড়িয়ে গিটারের সুরে তৈরি করতেন নতুন ইতিহাস।

সেই সম্ভাবনাগুলো আজ আর বাস্তবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু তার গান, গিটারবাদন ও নতুনদের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা রয়ে গেছে। অপূর্ণ স্বপ্নগুলো তাই শুধু আক্ষেপের গল্প নয়, বাংলাদেশের সংগীতজগতে তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেই প্রশ্নও তুলে ধরে।
  বিষয়:   আইয়ুব বাচ্চু  বাংলা ব্যান্ডসংগীত  এলআরবি  গিটার 


বিনোদন- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত