জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ, কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ভাঙচুর । ছবি: সংগৃহীতইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসন সংকট ও শিক্ষাব্যবস্থার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ থেকে রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে শনিবারের বিক্ষোভের কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সরকারগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বিক্ষোভের মধ্যে ফ্রান্সের পরিস্থিতি সবচেয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবন, দোকানপাট ও সুপারমার্কেটে হামলা এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পুলিশ সদস্য ও যানবাহনও হামলার শিকার হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানান, সংঘাতের ঘটনায় এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। মধ্য প্যারিসে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি না হওয়াটা অলৌকিক ব্যাপার।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, নিস, নান্তেস, বর্দো, লিমোগেস, লিলি, তুলুউজ ও স্ট্রাসবুর্গে দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোইরে রাজধানীর রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানান। লিমোগেসে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো টাউন হল প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। মার্সেই ও লিলির টাউন হলও ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়। লিওঁ শহরের প্রধান পর্যটন কার্যালয়েও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এসব ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং অপরাধীদের বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধি ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছিল। শনিবারের বিক্ষোভে কয়েক শ মানুষ অংশ নেন। তাঁদের বেশির ভাগই তরুণ। বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারে এবং একটি গাড়ি উল্টে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন বলেন, পরিস্থিতি আর সাধারণ বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্রাসেলসের পাশাপাশি দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়েজেও বিক্ষোভ হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার ব্যয়, শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহের অসুবিধা এবং ফরাসিভাষী শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয়, কম মজুরি, বাড়িভাড়া ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি আবাসনের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও আন্দোলনে অংশ নেয়। বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে ছিল মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি, জনসেবার মান উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আবাসন নিশ্চিত করা। লিসবনের পাশাপাশি পোর্তো ও কোইমব্রাতেও কর্মসূচি পালনের আয়োজন করা হয়।
পর্তুগালে বাড়ির দাম ও ভাড়া দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের আবাসন ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারের আয়ের বড় অংশ বাসাভাড়ায় চলে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়ের সঙ্গে আবাসন ব্যয় যুক্ত হয়ে জীবনযাত্রার চাপ আরও বাড়িয়েছে।
পর্তুগালের পার্লামেন্টবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম শুক্রবার বলেন, সরকার রাস্তায় ওঠা স্লোগানের কাছে নতি স্বীকার করবে না। তবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক সংকট যথাযথভাবে উপলব্ধি করছে না।
ইতালির মিলান শহরের কেন্দ্রস্থলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও যুদ্ধের প্রতিবাদে শুরু হওয়া মিছিল একপর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ও ইটের টুকরো ছুড়ে মারে। রাস্তার বার টেবিল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকটি দোকানে লুটপাট ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। মিলানের বিখ্যাত পিয়াজ্জা দেল দুওমো এলাকা এবং একটি বিলাসবহুল বিপণিবিতান থেকে মানুষকে সরে যেতে হয়। ইতালীয় বার্তা সংস্থা লাপ্রেসের বরাতে জানা গেছে, অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কসহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, বিক্ষোভ করা মানুষের অধিকার, তবে শহরে আগুন জ্বালানো বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অধিকার কারও নেই। তিনি বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে সহিংসতা চালানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
মিলানের কেন্দ্র-বামপন্থী মেয়র গিউসেপ্পে সালা বলেন, বিক্ষোভের পেছনে থাকা মানুষের ক্ষোভের কারণগুলো বোঝা যায়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা ও শহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বোলোনিয়া শহরেও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভের মধ্যে ফ্রান্সের আন্দোলন সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করেছে। তবে বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালের ঘটনাগুলোও একই ধরনের আর্থসামাজিক অসন্তোষের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম, আবাসন সংকট এবং শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা বিভিন্ন দেশের মানুষের ক্ষোভকে এক জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে।
এইচইসি প্যারিস বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হলেও অন্যান্য দেশেও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তার ধারণা, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতেও আন্দোলনের প্রাথমিক প্রস্তুতি তৈরি হচ্ছে এবং আগামী সপ্তাহগুলোতে নতুন বিক্ষোভের কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে।
তবে এসব বিক্ষোভকে একটি একক আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বিভিন্ন দেশে আলাদা আলাদা দাবিতে কর্মসূচি পালিত হলেও মানুষের আর্থিক চাপ, শিক্ষা ও আবাসনসংক্রান্ত সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মিল রয়েছে।ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আগামী ১২ মাসে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এমন সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বড় আকারের বিক্ষোভ সরকারগুলোর জন্য বাড়তি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়, মজুরি, আবাসন এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অধ্যাপক আলেমান্নো।
ফ্রান্সে বিক্ষোভের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের জবাব দেওয়া সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। অন্য দেশগুলোর সরকারও একই ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। ইউরোপজুড়ে এসব বিক্ষোভের পরিণতি কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ও শিক্ষার সুযোগ নিয়ে জনঅসন্তোষ যে রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাবে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।