ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার বিল ডাকাতিয়া অঞ্চল।টানা পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার বিল ডাকাতিয়া অঞ্চল। বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, মাছের ঘের ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এখনো পানির নিচে।
কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন অর্ধশত গ্রামের হাজার হাজার পরিবার। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় মাছের ঘের ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি দেখা দিয়েছে খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট। সব মিলিয়ে অঞ্চলজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে মানবিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতি।
সরেজমিনে উপজেলার রংপুর, রঘুনাথপুর, ধামালিয়া ও রুদাঘরা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পানিতে ডুবে আছে বসতবাড়ি ও চলাচলের রাস্তা। কোথাও কোথাও নৌকা ও ভেলাই মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। পানিবন্দি অবস্থায় শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। জরুরি রোগী ও গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিল ডাকাতিয়ার বারাণসী গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী সাবিত্রী মল্লিক বলেন, “পাঁচ মাস ধরে চারদিকে শুধু পানি আর পানি। এক ফোঁটা খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতেও প্রতিদিন এক কিলোমিটারের বেশি পথ নৌকা বেয়ে যেতে হয়। কাজ নেই, আয় নেই—সংসার চালানোই এখন দায় হয়ে পড়েছে।
কৃষি ও মৎস্যনির্ভর বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা মাছের ঘের এবং বেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ। কিন্তু দীর্ঘদিন জমিতে পানি জমে থাকায় মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পচে নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন ফসল। এতে কৃষক, মৎস্যচাষি ও দিনমজুরদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে।
অনেক পরিবার সংসারের খরচ ও খাবারের জোগান দিতে নিজেদের শেষ সম্বল গরু-বাছুর পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় পরিবারগুলো ঋণ ও আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আশঙ্কা, দ্রুত পানি না নামলে আগামী মৌসুমেও কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে বিল ডাকাতিয়ার মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হলেও স্থায়ী ও টেকসই সমাধান হয়নি। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই দুর্ভোগ বাড়ছে। এবার দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিল ডাকাতিয়ার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম শোলমারী নদীর ১০ ভেন্টের স্লুইসগেট। কিন্তু নদীটি পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং স্লুইসগেটের মুখে পলি জমার কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিলের পানি দ্রুত নামতে পারছে না।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতিমধ্যে স্লুইসগেটের পাঁচটি কপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কিছুটা পানি নিষ্কাশন হচ্ছে। পাশাপাশি ময়ূর নদী দিয়েও পানি নিষ্কাশনের গতি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
বিল ডাকাতিয়ার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজগার লবি। তিনি জানান, এ অঞ্চলের নদী পুনঃখনন ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বিদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত প্রকল্প কবে বাস্তবায়িত হবে, শোলমারী নদী পুনঃখনন কখন শুরু হবে কিংবা কবে নাগাদ পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে পানিবন্দি অবস্থায় থাকা বিল ডাকাতিয়ার মানুষের এখন একটাই দাবি—দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।