ছবি-যাযাদি সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে আটক চার জেলের পরিচয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বন বিভাগের দায়ের করা মামলায় আসামিদের নাম ও পিতার পরিচয়ের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের অমিল দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের নামে থাকা বোর্ড লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকৃত পরিচয় গোপন করে ভিন্ন নাম ব্যবহার করেছেন তাঁরা। তবে পরিচয় গোপনের পেছনে বিএলসি রক্ষার উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কয়রা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সঞ্জয় পাল চার জেলেকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর আগে বুধবার (১৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতে সুন্দরবনের ভোমরখালী অভয়ারণ্যের বড় কুকুমারি খাল এলাকা থেকে তাঁদের আটক করে বন বিভাগ।
বন বিভাগের দায়ের করা মামলায় আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে আবু বকর (৪২), পিতা আবদুল জলিল; আছাদুল (৩০), পিতা আমিরুল গাজী; পীর আলী (২৮), পিতা নুর সরদার এবং কাদের মোল্যা (৫৫), পিতা মালেক মোল্যা। তাঁদের সবার বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার ৫ নম্বর কয়রা এলাকায়।
তবে বন বিভাগের সরবরাহ করা ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে অনুসন্ধানে চারজনের ভিন্ন পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন আবুল বাসার গাজী (৩৫), পিতা আকবার আলী গাজী; মো. হাবিবুল্লাহ হোসেন (৩০), পিতা নুরআলী গাজী; রবিউল ইসলাম (৩৫), পিতা মোছাক মোড়ল এবং হামিদ সানা (৪৫), পিতা আনসার আলী সানা।
বিএলসি রক্ষায় পরিচয় গোপনের অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মো. হাবিবুল্লাহ হোসেনের নামে ২৬২৭০৫০১১৯৮ নম্বর এবং আবুল বাসার গাজীর নামে ২৬২৭০৫০১২১২ নম্বর বোর্ড লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ঘটনায় প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পেলে তাঁদের লাইসেন্সের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে ভিন্ন নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে বিএলসি দুটির বর্তমান অবস্থা, সেগুলোর সঙ্গে মামলার আসামিদের সম্পর্ক এবং পরিচয় গোপনের অভিযোগের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, হাবিবুল্লাহ ও আবুল বাসার সুন্দরবন ব্যবস্থাপনা কমিটির এক নেতার চাচাতো ভাই। ওই আত্মীয়তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাঁরা সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও হরিণ শিকারের মতো বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কারাগারে থাকায় তাঁদের বক্তব্যও পাওয়া সম্ভব হয়নি।
পরিচয় যাচাই ছাড়াই মামলা?
চার জেলের পরিচয়ে অমিলের ঘটনায় বন বিভাগের মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভোমরখালী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ছামাদুল কাদিরের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো বিএলসি, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা পাস পারমিট পাওয়া যায়নি। তাঁরা যে নাম-পরিচয় দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী বন আইনে মামলা করা হয়েছে।
এ অবস্থায় আটক ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, মামলার এজাহারে ব্যবহৃত নাম ও পিতার পরিচয় কোন তথ্যের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে পরিচয়ের অমিল ধরা পড়লে তা যাচাইয়ের কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে ভোমরখালী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ছামাদুল কাদির বলেন, সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সময় চার জেলেকে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে কোনো বিএলসি, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা পাস পারমিট পাওয়া যায়নি। আসামিরা যে নাম-পরিচয় দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী বন আইনে মামলা করা হয়েছে।
প্রকৃত পরিচয় গোপনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, আসামিরা প্রকৃত পরিচয় গোপন করে থাকলে তাঁদের সঠিক পরিচয় শনাক্ত করা হবে। পরিচয়ে অমিল পাওয়া গেলে তা সংশোধনের জন্য আদালতে আবেদন করা হবে।
এখন নজর বন বিভাগের পদক্ষেপে
সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগের পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে এমন অমিলের বিষয়টি সামনে আসায় মামলার নথি ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া গুরুত্ব পেয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত, বিএলসি-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজন হলে আদালতের নথি সংশোধনে বন বিভাগ কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।