আহসান হাবিব বরুনজুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার পথ রচনার ঐতিহাসিক সংগ্রাম চলছে, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারী শক্তির চরম রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। ইতালি বা রোমের রাজপথ থেকে শুরু করে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর পর্যন্ত প্রবাসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার যে নোংরা চক্রান্ত শুরু হয়েছে, তা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে পড়ে না। এই ধরনের শিষ্টাচারবর্জিত উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কেবল পরাজিত ফ্যাসিবাদের নীতিগত পচনের চিত্রই তুলে ধরে না, বরং রাষ্ট্র এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের বার্তা দেয়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা করার যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও চরম দুঃখজনক। ড. ইউনূস কেবল একটি নির্দিষ্ট সরকারের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি নন, তিনি বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ও প্রশংসিত একজন অনন্য বিশ্ববরেণ্য আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। নিউ ইয়র্কের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে যে অসভ্য হট্টগোল ও হেনস্তার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, তা আমাদের জাতিগত সম্মান ক্ষুণ্ন করার নামান্তর। মাস দেড়েক আগে ইতালির রোমে ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও সুপরিচিত অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল একই সুবিধাবাদী চক্রান্তকারী গোষ্ঠী। রাজপথে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াকু কণ্ঠস্বরের ওপর দেশে-বিদেশে এমন অতর্কিত ও সহিংস হামলা প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগ আজ রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি দেউলিয়া ও প্রতিহিংসাপরায়ণ একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। রাজপথের লড়াইয়ে গণঅভ্যুত্থানের কাছে হেরে গিয়ে প্রবাসের মাটিতে গুটিকয়েক সন্ত্রাসীকে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই এখন তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দেওয়ার একমাত্র উপায়ে পরিণত হয়েছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সংকটকালীন মুহূর্তে ড. ইউনূসের উপস্থিতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শেখ হাসিনার গণভবন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর সেই উত্তাল ও অনিশ্চিত সময়ে দেশে টানা তিন দিন কার্যত কোনো সরকার ছিল না। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র, পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। যদি সেই অতি সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর সময়ে ড. ইউনূসের মতো একজন সর্বজনমান্য বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ না করতেন, তবে পরাজিত ও পতিত স্বৈরাচারী শক্তি এবং তাদের দেশি-বিদেশি দোসররা রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেওয়ার এক মহাসুযোগ পেয়ে যেত। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দেশে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই ছিল সেই ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস সামনে এসে দাঁড়ানোর কারণেই প্রবাস ও দেশের ভেতরের চক্রান্তকারীরা সেই ধ্বংসাত্মক পথে বেশিদূর এগোতে পারেনি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির কারণেই। সুতরাং, শাসন পরিচালনায় তাঁর সুনির্দিষ্ট ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার কড়া সমালোচনা করা যেমন নাগরিক ও সংবাদপত্রের দায়িত্ব, তেমনি চরম জাতীয় দুর্যোগের মুহূর্তে রাষ্ট্রকে নৈরাজ্যের হাত থেকে রক্ষা করায় তাঁর ঐতিহাসিক অবদানের কথা অস্বীকার করাও চরম অকৃতজ্ঞতা হবে।
অন্যদিকে প্রশাসনের ভেতরের অদৃশ্য শত্রু ও নব্য রূপান্তরকারীদের চক্রান্তকে এড়িয়ে গেলে এই বিশ্লেষণের পূর্ণতা আসে না। শেখ হাসিনার পতনের পর প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তা রাতারাতি নিজেদের খোলস বদলে ফেলেছেন। তাঁরা এখন ছদ্মবেশ ধারণ করে নিজেদের ‘নব্য বিএনপি’ বা নতুন রাজনৈতিক ধারার অনুসারী হিসেবে জাহির করছেন এবং সুবিধাজনক পদগুলোতে বহাল থাকছেন। বাস্তবে এই সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো তাঁদের পুরোনো প্রভুদের সুদূরপ্রসারী এজেন্ডা বাস্তবায়নে গোপনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ টেবিলে বসে তাঁরা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছেন, কৃত্রিম প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করছেন এবং সরকার ও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বাড়িয়ে দেশজুড়ে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন।
গুলশানের মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকায় পতিত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা কীভাবে মিছিল করার দুঃসাহস পেলেন, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক উঠে। পরবর্তীতে ওই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে গুলশান থানার ওসি এবং ডিএমপির সংশ্লিষ্ট ডিসিকে প্রত্যাহার করা হলেও জনমনে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছেছে যে, প্রশাসনের একটি অংশ আওয়ামী দোসরদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশ রেখেই এই বিশৃঙ্খলা ঘটানোর পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন থানায় এখনো আওয়ামী দোসরদের পদায়ন করা হচ্ছে এবং এর পেছনে একটি শক্তিশালী পদ-বাণিজ্য সিন্ডিকেটের কারসাজি কাজ করছে বলেও অত্যন্ত জোরালো অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চক্রান্তের পাশাপাশি দেশে ভীতি ও নৈরাজ্য ছড়ানোর জন্য সন্ত্রাসী পন্থার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মধ্যরাতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট চক্র। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত অঞ্চল, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে মধ্যরাতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, যা কেবল নিরাপত্তাহীনতার চিত্রকেই স্পষ্ট করে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে, পতিত ও পলাতক শক্তি দেশে রাজনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখতে এখন চূড়ান্ত নৈরাজ্যকেই হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে।
পরিশেষে বলতে চাই, রোমের রাজপথ থেকে নিউ ইয়র্কের আন্তর্জাতিক মঞ্চ, কিংবা গুলশানের সরণি থেকে সুরক্ষিত চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ—এই সবকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা প্রকৃতপক্ষে একই সুতোয় গাঁথা এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। নীতি, আদর্শ ও জনসমর্থন হারিয়ে রাজনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ এখন চক্রান্ত ও অপপ্রচারের ওপর ভর করে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে। তবে ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জনতার রায়ে যে দল রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যায়, কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তারা রাষ্ট্রকে পুনরায় জিম্মি করতে পারে না। বর্তমান সংকট কাটাতে হলে সরকারকে অবিলম্বে প্রশাসনে লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশী চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে, পদ-বাণিজ্য সিন্ডিকেটকে গোড়া থেকে নির্মূল করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রবাসীদের নিয়ে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এই ঐতিহাসিক পর্যায়ে ব্যর্থতার নিরপেক্ষ সমালোচনা যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, তেমনি দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক যাত্রাকে নস্যাৎ করার সব অপচেষ্টাকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।