গঙ্গা চুক্তির সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: ফারাক্কা থেকে নতুন পানি-সমীকরণ

ড. মোঃ মিজানুর রহমান

মতামত

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। ৩০ বছরের সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে

2026-10-13T15:48:40+06:00
2026-10-13T15:48:40+06:00
মঙ্গলবার ● ১৩ অক্টোবর ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
গঙ্গা চুক্তির সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: ফারাক্কা থেকে নতুন পানি-সমীকরণ
ড. মোঃ মিজানুর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৮ পিএম  
ছবি: লেখক সৌজন্য
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। ৩০ বছরের সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর। ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে এখন শুধু একটি পুরোনো চুক্তি নবায়নের প্রশ্ন নয়; বরং আগামী কয়েক দশকের জন্য দুই দেশের পানি-সম্পর্কের নতুন কাঠামো নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। গঙ্গা হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে প্রায় ২১৬ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মা নাম ধারণ করে; আরও প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভাটির দিকে গিয়ে চাঁদপুরের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। গড়াই, কুমার ও মাথাভাঙ্গাসহ এর বিভিন্ন শাখা দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের পানি-ব্যবস্থা ও সুন্দরবনের পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গঙ্গার পানি শুধু কৃষি ও মৎস্যের উৎস নয়; শুষ্ক মৌসুমে এর প্রবাহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সেচ, মৎস্যসম্পদ ও নৌপরিবহন সচল রাখা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো, গড়াইসহ শাখা-নদীর প্রবাহ বজায় রাখা এবং সুন্দরবনের মিঠাপানির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত মিঠাপানি না থাকলে সুন্দরবন ও উপকূলে লবণাক্ততা বাড়তে পারে, যা কৃষি, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও মানুষের জীবিকাকে প্রভাবিত করে। ফলে নতুন চুক্তিতে শুধু ফারাক্কায় পানির পরিমাণ বণ্টন নয়, পরিবেশগত প্রবাহ, শুষ্ক মৌসুমের পানি-নিরাপত্তা, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং সমগ্র অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

এই প্রবাহব্যবস্থায় ফারাক্কা ব্যারাজে গঙ্গার একটি অংশ ৩৮.৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার খালের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা হয়, যার ধারণক্ষমতা প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক। উজানে প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের নামে ভাটিতে পানির প্রাপ্যতা বদল করে দিচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক ও নৌপরিবহনগত প্রয়োজনের নামে ভাটির পানি-নিরাপত্তার দ্বন্দ্ব এই ফারাক্কা শেষ পর্যন্ত একটি প্রকৌশল প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের চুক্তি প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসের শুষ্ক মৌসুমে কার্যকর হয়। ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহ অনুযায়ী পানি ভাগের জন্য তিনটি স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে: প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ ৫০:৫০ ভাগ পাবে; ৭০–৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পাবে এবং অবশিষ্ট ভারত; আর ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পাবে এবং অবশিষ্ট বাংলাদেশ। ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত তিনটি পর্যায়ে উভয় দেশকে পালাক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পাওয়ার নিশ্চয়তাও রয়েছে।

কিন্তু ১৯৯৬ সালের চুক্তির সময় যে জলপ্রবাহ, জলবায়ু, জনসংখ্যা, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বাস্তবতা ছিল, ২০২৬ সালে এসে তা অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু, ‘চুক্তি থাকবে কি থাকবে না’ এমন নয়। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত: আগামী দিনে কম পানি, অনিয়মিত বর্ষা, দীর্ঘস্থায়ী খরা কিংবা আকস্মিক অতিবৃষ্টির পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কীভাবে তার ন্যায্য ও নির্ভরযোগ্য পানির অধিকার নিশ্চিত করবে?

১৯৭০-এর দশকে এই বিরোধ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছে যায়। ১৯৭৭ সালে পাঁচ বছরের একটি পানি-বণ্টন চুক্তি হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে সমঝোতার চেষ্টা হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান হয়নি। ১৯৯৬ সালের চুক্তি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি অন্তত ৩০ বছরের জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য পানি-বণ্টন কাঠামো তৈরি করেছিল। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—এটি মূলত ফারাক্কায় উপলব্ধ শুষ্ক মৌসুমের পানি কীভাবে ভাগ হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে; গঙ্গা অববাহিকার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, পানির উৎসস্থলে পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত উত্তোলন, পরিবেশগত প্রবাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি পানি-সংকটকে একই কাঠামোর মধ্যে পুরোপুরি আনতে পারেনি।

এখানেই আন্তর্জাতিক নদী আইনের গুরুত্ব আসে। আধুনিক আন্তর্জাতিক জল আইন মূলত তিনটি ধারণাকে গুরুত্ব দেয়—ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহার, অন্য দেশের ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা এবং তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা। এর অর্থ এই নয় যে আন্তর্জাতিক আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট কোনো শতাংশ পানি দিয়ে দেয়। বরং উজানের দেশের বৈধ ব্যবহার এবং ভাটির দেশের ন্যায্য অধিকার—দুটিকে ভারসাম্যের মধ্যে রাখাই এর উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ২৩ জুন জাতিসংঘের পানি-সংক্রান্ত কনভেনশনে যোগ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর অংশ হয়েছে। ফলে আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য ও সহযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান এখন আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

তবে আইনি কাঠামো শক্তিশালী হলেই বাস্তব পানি-প্রবাহ নিশ্চিত হয় না। গঙ্গার ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে গেলে তার প্রভাব শুধু নদীর পানির স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, নদীর নাব্যতা কমে, মাছের প্রজনন ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠা পানির প্রবাহ দুর্বল হলে লবণাক্ততার চাপ বাড়ে। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, যদিও সেখানে লবণাক্ততা কেবল গঙ্গার প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল নয়; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জোয়ার-ভাটা, বৃষ্টিপাত, পলি ও স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনাও ভূমিকা রাখে। তাই গঙ্গার পানি নিয়ে বাংলাদেশের যুক্তি হওয়া উচিত—‘আমাদের আরও কিউসেক চাই’—এর পাশাপাশি ‘আমাদের কৃষি, পরিবেশ ও উপকূলীয় নিরাপত্তার জন্য কতটা নির্ভরযোগ্য মিঠা পানির প্রবাহ প্রয়োজন’।
এই জায়গায় ১৯৯৬ সালের চুক্তির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। চুক্তি পানির পরিমাণ ভাগ করে, কিন্তু ঝুঁকি কীভাবে ভাগ হবে তা পর্যাপ্তভাবে নির্ধারণ করে না। স্বাভাবিক প্রবাহ, অস্বাভাবিক খরা এবং চরম খরার জন্য একই ধরনের কাঠামো কার্যকর রাখা ভবিষ্যতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হলে ‘উপলব্ধ পানি ভাগ’ করার পুরোনো পদ্ধতির পরিবর্তে ‘ঝুঁকি ভাগাভাগি’র নীতি প্রয়োজন।

বর্তমান বাংলাদেশ–ভারত রাজনৈতিক সম্পর্কের বাস্তবতাও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। দুই দেশের সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রে আস্থার ঘাটতি বা টানাপোড়েন তৈরি হলে পানি-প্রশ্নও বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠতে পারে। আবার বিপরীত দিক থেকেও বলা যায়, গঙ্গা চুক্তির মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দুই দেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে গঙ্গার প্রশ্নকে আবেগনির্ভর রাজনৈতিক বিরোধে পরিণত না করে একটি স্বতন্ত্র, প্রাতিষ্ঠানিক, তথ্যভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পানি-কূটনীতির আওতায় রাখা।

এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান–ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনার একটি স্থিতিশীল কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে ভারত চুক্তিটি ‘অবকাশে’ রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর বিষয়টি গুরুতর অচলাবস্থায় পড়ে। পাকিস্তান চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ায় যায়। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট হেগের Permanent Court of Arbitration চুক্তির অবস্থান নিয়ে রায় দেয় এবং চুক্তির অধীনে সালিশি কার্যক্রম চালিয়ে যায়।

সিন্ধু অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আইনি রায় নিজে নদীর পানি প্রবাহিত করতে পারে না। একটি রাষ্ট্র আদালতের এখতিয়ার বা রায় প্রত্যাখ্যান করলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে যেতে পারে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা-ব্যবস্থা, কিন্তু তার সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকলে বাস্তব ফল সীমিত হতে পারে। বাংলাদেশের উচিত তাই গঙ্গা চুক্তির নতুন কাঠামোয় বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা আগের চেয়ে আরও স্পষ্ট ও কার্যকর করা।

বাংলাদেশের করণীয় এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নতুন চুক্তিতে শুধু গড় প্রবাহ নয়, স্বাভাবিক বছর, নিম্নপ্রবাহের বছর এবং চরম খরার বছর—তিন ধরনের পরিস্থিতির জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে পানি-বণ্টনের হিসাবের বাইরে নদী ও প্রতিবেশের প্রয়োজন উপেক্ষিত না হয়। তৃতীয়ত, ফারাক্কাসহ গুরুত্বপূর্ণ মাপনী পয়েন্টে দুই দেশের যৌথ তথ্য সংগ্রহ, তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় এবং প্রয়োজনে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের কারিগরি যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

চতুর্থত, নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা দরকার। ৩০ বছর পরপর একবার চুক্তি বদলানোর পরিবর্তে পাঁচ বা দশ বছর অন্তর বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমবে। পঞ্চমত, গঙ্গার পানি বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে ভারত, বাংলাদেশ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নেপালসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানো দরকার। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতেও দীর্ঘমেয়াদে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করা হয়েছিল। সুতরাং পানি ভাগাভাগির পাশাপাশি পানি বাড়ানোর কৌশলও আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।

ষষ্ঠত, বাংলাদেশকে নিজের ঘরও গুছাতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল-বিল পুনরুদ্ধার, সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন কমানো, নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো বাড়ানো ছাড়া শুধু আন্তঃসীমান্ত চুক্তির ওপর নির্ভর করে পানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। জাতীয় পর্যায়ে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার একটি স্থায়ী বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

এখানে একটি প্রশ্ন প্রায়ই আসে—বাংলাদেশ কি তিস্তা ব্যারাজের মতো পদ্মার ওপর নতুন কোনো ব্যারাজ নির্মাণ করে সমস্যার সমাধান করতে পারে? উত্তর হলো, ব্যারাজ কিছু ক্ষেত্রে পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু পানি সৃষ্টি করতে পারে না। উজান থেকে পর্যাপ্ত প্রবাহ না এলে বড় ব্যারাজও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না। বরং ভুল সময়ে অতিরিক্ত পানি আটকে রাখা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি পরিবহন, মাছের চলাচল এবং নিম্নপ্রবাহের পরিবেশে নতুন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের আগে অববাহিকাভিত্তিক পানি-হিসাব, পরিবেশগত প্রভাব এবং আন্তঃসীমান্ত কূটনৈতিক প্রভাব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বরের আগে যদি নতুন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চূড়ান্ত না হয়, তাহলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পানি-বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়ে যদি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা, জরুরি পরামর্শ প্রক্রিয়া এবং বিরোধ নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট কাঠামো আগে থেকেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত গঙ্গা চুক্তির প্রশ্নটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি আবেগময় অধ্যায় হলেও এর সমাধান আবেগ দিয়ে হবে না। প্রয়োজন তথ্য, বিজ্ঞান, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং পারস্পরিক স্বার্থের বাস্তব সমন্বয়। বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘আরও পানি’ নয়; বরং নির্ভরযোগ্য পানি, ন্যায্য পানি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই পানি-নিরাপত্তা।

ফারাক্কার ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, একতরফা নদী-নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট তৈরি করে। ১৯৯৬ সালের চুক্তি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা সম্ভব। আর বর্তমান সিন্ধু পানি চুক্তির অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়লে বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। তাই নতুন গঙ্গা চুক্তির ভিত্তি হওয়া উচিত—শুধু পানি ভাগ নয়; পানি, ঝুঁকি, তথ্য, দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ন্যায্য ভাগাভাগি।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। গঙ্গা চুক্তিকে কেবল নবায়ন না করে এটিকে একটি আধুনিক অববাহিকাভিত্তিক পানি-নিরাপত্তা কাঠামোতে রূপান্তর করা গেলে ফারাক্কা-পরবর্তী দীর্ঘ বিরোধ নতুন সহযোগিতার পথে যেতে পারে। আর যদি আলোচনার কেন্দ্র শুধু পুরোনো কিউসেকের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আগামী কয়েক দশকের পরিবর্তিত জলবায়ু ও পানি-বাস্তবতার সামনে ১৯৯৬-এর কাঠামো আবারও অপ্রতুল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।



লেখকঃ অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
  বিষয়:   মতামত  গঙ্গা চুক্তি  ফারাক্কা 


মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত