সংগৃহীত ছবিকিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মান উন্নয়নে বরাদ্দকৃত ৪৩০ কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির ঘটনা ধামাচাপা দিতে পর্দার আড়ালে নানা তৎপরতা চলছে। নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম ও হরিলুটের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরেও দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের প্রভাবে থমকে আছে তদন্ত কার্যক্রম। সিন্ডিকেটের কারণে একাধিকবার তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। নতুন কমিটিও রহস্যজনক কারণে নির্ধারিত সমমেয় মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রভাবশালী এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালকের সরাসরি হস্তক্ষেপে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে রীতিমত ‘নয়ছয়’ শুরু হয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর সুত্রে জানা গেছে, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও মান উন্নয়নের জন্য এই বিশাল অংকের ফান্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বহুতল ভবন, ছাত্র-ছাত্রী নিবাস, বিজ্ঞানাগার, পাঠাগার এবং আইসিটি ল্যাব নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ, আর আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৫৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। কিন্তু এর মধ্যেই ১৪টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হতে না হতেই সেগুলোতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে এবং ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার মতো মারাত্মক কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে।
সরকারি অডিট অধিদফতরের প্রাথমিক নথিতেই এই প্রকল্পের ১৪টি ভবনের বিপরীতে ৩৪ কোটি ২৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট আপত্তি তোলা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের দাবি, বাস্তবে দুর্নীতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি। অনেক ভবনের সিভিল কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদাররা শতভাগ বিল তুলে নেয়া হয়েছে। ল্যাবরেটরি ও আইসিটি কক্ষগুলো ফাঁকা পড়ে রয়েছে। বিজ্ঞানাগার ও আইসিটি ল্যাবের জন্য কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বা কম্পিউটার কেনা হয়নি। এমনকি এসব সামগ্রী কেনার জন্য সর্বনিম্ন প্রশাসনিক উদ্যোগও নেয়া হয়নি। অথচ ভুয়া ভাউচার ও তড়িঘড়ি করে মালামাল ক্রয়ের কাগজ সাজিয়ে কোটি কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে যা লুটপাট করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অষ্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আলহাজ্ব আবদুল ওয়াদুদ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবনে এখনই ভয়াবহ ফাটল ধরেছে। ইট ও সিমেন্টের প্রাক্কলন ঠিকমতো না দেয়ায় দেয়ালের গাঁথুনির ফাঁক দিয়ে অনবরত পানি ভেতরে ঢুকছে, যা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। একই ধরনের বিপজ্জনক চিত্র ধরা পড়েছে মিঠামইনের বিরাটী উচ্চ বিদ্যালয় ও কাষ্টপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন ভবনে। এসব ভবনের ছাদে বর্ষার পানি জমে শেওলা পড়ে গেছে। যেকোনো সময় ছাদ ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শিক্ষকরা। নিকলী উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ সরকারি কলেজের নতুন ভবনের কাঠামো দাঁড়ানো হলেও সেটির ফিনিংশিং কাজ অত্যন্ত নিম্নমানের হয়েছে। দরজায় ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের কাঠ।
নজিরবিহীন এই দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করতে প্রথমে চলতি বছরের ৬ আগস্ট একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায় প্রকৌশলী (সিভিল) মো. আসাদুজ্জামানকে সভাপতি, সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. মাজহারুল ইসলামকে সদস্য এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) আবু সাঈদকে সদস্য সচিব করে গঠিত কমিটি তদন্তের জন্য মাঠে নামে। কিন্তু এক অদৃশ্য কারণে মাত্র তিন দিনের মাথায়, অর্থাৎ ৯ আগস্ট কমিটি ভেঙে দিয়ে তড়িঘড়ি করে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত কমিটিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মো. আলী ইমামকে সভাপতি, সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. মাজহারুল ইসলামকে সদস্য এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মৌরিন আক্তার মৌ’কে সদস্য সচিব করা হয়। দুর্নীতি ঢাকতেই কমিটি পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠেছে।
বর্তমান কমিটির সদস্য সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. মাজহারুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, ‘আমরা গত মাসে স্পটে গিয়েছিলাম। আমার যতটুকু দায়িত্ব সেটা পালন করেছি। তদন্তের পুরো বিষয়টা আলী ইমাম স্যার দেখছেন। এতোদিনে হয়তো রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। আমি ঠিক জানি না। তবে স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে হয়তো জানতে পারবেন।’
কমিটির সভাপতি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আলী ইমাম তদন্তে যাওয়ার আগে যায়যায়দিনকে বলেছিলেন, ‘আমারা স্পটে গিয়ে পুরো তদন্ত করে রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দিব। তদন্তের আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।’ তবে তদন্ত শেষে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অধিদফতরের অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে, তদন্ত কমিটির ওপর প্রতিবেদন হালকা করা এবং মূল অভিযুক্তদের রক্ষার জন্য উপর মহল থেকে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যার কারণে রবিবার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা জমা পড়েনি।
এই বিশাল দুর্নীতি ও লজিস্টিকস জালিয়াতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. শাহজাহান আলী। তার বিরুদ্ধে ৫ শতাংশ নির্দিষ্ট কমিশন ছাড়া ফাইল না ছাড়া, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্য ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেয়ার অসংখ্য লিখিত অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়ে চলতি বছরের ২৩ জুলাই তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়েছিল। কিন্তু এক অলৌকিক প্রশাসনিক প্রভাবে মাত্র ১৮ দিনের মাথায়, গত ১২ আগস্ট তাকে পুনরায় অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। যা পুরো ইইডিতে চরম তোলপাড়ের সৃষ্টি করেছে।
বিভাগীয় নথিতে দেখা যায়, মো. শাহজাহান আলী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী প্রধান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের ছত্রছায়ায় ইইডিতে নিজের একক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তদবির ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি নিজ জেলা জামালপুরে হাজার কোটি টাকার কাজের নিয়ন্ত্রণ করতেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আছে। যার মধ্যে রংপুরে বিলাসবহুল বাড়ি, ঢাকার উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন এলাকায় বেনামে শত শত একর জমি কেনার তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাথমিক তদন্তে ওঠে এসেছে। এমনকি পদোন্নতির মেধা তালিকায় জালিয়াতি করে যোগ্য কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিজে পদ দখল করার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত প্রকৌশলী মো. শাহজাহান আলী এসব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, ‘এই প্রকল্পের মূল নকশা ও সিংহভাগ কাজ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি ২০২৫ সালের দিকে এই প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাই পূর্বের কোনো অনিয়ম বা টেকনিক্যাল ত্রুটির বিষয়ে তিনি অবগত নন। তদন্ত কমিটি গঠনে বা প্রতিবেদন জমা দিতে দেরি হওয়ার পেছনে তার কোনো ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক হাত নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
হাওরাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ত্রুটিপূর্ণ ও বিপজ্জনক ভবন নিয়ে চরম ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে যে লুকোচুরি ও নয়ছয় চলছে, তার অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা উচিত। অন্যথায় শিক্ষা খাতের এই বিশাল রাষ্ট্রীয় অপচয় ও জালিয়াতি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিবে।