উমর ফারুক
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আবারো খুলতে যাচ্ছে মালয়শিয়ার শ্রম বাজার। তবে বাজার খোলার আগেই পুরনো আতঙ্ক ফিরে এসেছে— সিন্ডিকেটের। একদিকে তিন মাসের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে মালয়শিয়ায় পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে ৩৩৮ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। জনশক্তি রফতানিকারকদের একাংশের আশঙ্কা, নাম বদলালেও পুরনো সিন্ডিকেটই নতুন মোড়কে ফিরে আসতে পারে।
সরকার অবশ্য বলছে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। মালয়শিয়ার সঙ্গে ধারাবাহিক ডিপ্লোম্যাটিক যোগাযোগের ফলেই বিশেষ সুযোগ মিলেছে। প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে ‘জিরো-কস্টে’ নেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে মালয়শিয়া। তাদের বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট এন্ড সার্ভিসেস লিমিটেড-বোয়েসেলের মাধ্যমে পাঠানোর প্ল্যান রয়েছে। কর্মীদের প্লেন ভাড়া বা অন্য কোনো ইমিগ্রেশন ব্যয় বহন করতে হবে না।
প্রধান মন্ত্রী তারকে রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান গত ১ সেপ্টেম্বর জানান, বাংলাদেশের ধারাবাহিক ডিপ্লেম্যাটিক প্রচেষ্টায় মালয়শিয়া আগামী ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রথম দলটি বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়শিয়া যাবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় ওই ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। গত ২০২৪ সালের জুনে মালয়শিয়া যেতে না পারা প্রায় পাচ হাজার কর্মীকেও এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় নেয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে সেপ্টেম্বরে মালয়শিয়ার শ্রম বাজার কার্যত চালু হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের অনুরোধেই মালয়শিয়া ১০ হাজার কর্মীকে জিরো-কস্টে নেয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে একাধিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পাশাপাশি প্রধান মন্ত্রীর মালয়শিয়ার প্রধান মন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে আলোচনায় শ্রম বাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
কিন্তু শ্রম বাজার খোলার এই সম্ভাবনার মধ্যেই নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে এজেন্সি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক। গত ২১ আগস্ট মালয়শিয়ার বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম ‘এফডাবলইউসিএমএস’-এ প্রথমে বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়। তখনই প্রশ্ন ওঠে, শ্রম বাজার কি আবারো সীমিত সংখ্যক এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে? কারণ, কিভাবে কর্মী নিয়োগ হবে, কারা সরাসরি কাজ করবে এবং জব অর্ডার কিভাবে বণ্টন হবে, এসব বিষয় তখনো স্পষ্ট ছিল না।
এরপর ২৮ আগস্ট প্রকাশ করা হয় আরো বিস্তৃত তালিকা। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মালয়শিয়া সরাসরি ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করেছে। এসব মূল এজেন্সির অধীনে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সিকে কাজের সুযোগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের অধীনে আরো ৬২টি এজেন্সিকে যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৩৮টি এজেন্সির নাম এসেছে।
সরকার বলছে, এটি কোনো সিন্ডিকেট নয়; বরং মালয়শিয়ার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর জন্য আগের তুলনায় বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্ম সংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ছয় মাস ধরে বাংলাদেশ সরকারের ধারাবাহিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ বিবেচনায় মালয়শিয়া এ সুযোগ দিয়েছে। দেশটির মন্ত্রী সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচন করা হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থানকে সম্মান জানিয়ে আরো ৩১২টি এজেন্সিকে এসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেয়া হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলও কাজ করবে।
এজেন্সি বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিও এবার ভিন্ন বলে দাবি করছে সরকার। মালয়শিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি এ যাচাই-বাছাই করেছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, এ বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতাও ছিল না।
তবে এ ব্যাখ্যায় পুরোপুরি আশ্বস্ত নয় জনশক্তি রফতানিকারকরা। তাদের প্রশ্ন, ২৫টি মূল এজেন্সির অধীনে থাকা ১০টি করে সহযোগী এজেন্সি বাস্তবে কি ভূমিকা পালন করবে? তারা কি সরাসরি মালয়শিয়া থেকে ডিমান্ড আনতে পারবে এবং কর্মী পাঠাতে পারবে, নাকি মূল এজেন্সির সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে? কারণ এর আগে এফডাবলইউসিএমএস-এ প্রায় এক হাজার ৪০০ এজেন্সি তালিকাভুক্ত থাকলেও সরাসরি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পেয়েছিল প্রথমে ১০টি, পরে ২৫টি এবং শেষ পর্যন্ত ১০০টি এজেন্সি।
সংশ্লিষ্ট এক কর্তৃপক্ষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিষয়টি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। অনেক এজেন্সির মালয়শিয়ায় কর্মী পাঠানোর বাস্তব অভিজ্ঞতাও নেই। অন্য দেশের শ্রম বাজারের তুলনায় মালয়শিয়ার নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাঠামো আলাদা হওয়ায় ২৫টি মূল এজেন্সির অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে কাজ করবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।’
জনশক্তি রফতানিকারকদের অভিযোগ, অতীতে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সময় ৬০০-৭০০ এজেন্সি মূল এজেন্সির অধীনে কাজ করার সুযোগ পেলেও এবার সুযোগ আরো সীমিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, তালিকায় মূল এজেন্সি হিসেবে থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিগত সময়ে মালয়শিয়ায় কর্মী পাঠানোর রেকর্ডও নেই। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নেয়ার এক দশক পরও এক জন কর্মী পাঠাতে পারেনি।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আগেও আমরা এক হাজার ৪০০ রিক্রুটিং এজেন্সির নাম এফডাবলইউএমএসে পেয়েছি। কিন্তু কাজ করেছে মাত্র ২৫ জন। ফলে এখানে নতুন কিছু নেই। পুরনো জিনিসকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হাজির করা হয়েছে।’
মালয়শিয়ার শ্রম বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। গত এক দশকে একাধিকবার বাজারটি বন্ধ হওয়ার পেছনে অতিরিক্ত ইমিগ্রেশন ব্যয়, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০০৮ সালে মালয়শিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করে। আট বছর পর ২০১৬ সালে বাজারটি পুনরায় চালু হয়। কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে আবারো বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করে দেয় মালয়শিয়া। এরপর ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ২০২২ সালের আগস্টে আবার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বাজারটি খুলে যায়। কিন্তু ২০২৪ সালের ১ জুন আবারো বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৬-২০১৮ সালের মধ্যে মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী নিয়োগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সরকার নির্ধারিত ইমিগ্রেশন ব্যয় ছিল ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকা। কিন্তু কর্মীদের কাছ থেকে দুই লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই সময় প্রায় পাচ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও সামনে আসে।
২০২২ সালে প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর শ্রম বাজার আবার খুললেও একই ধরনের অভিযোগ ফিরে আসে। প্রথমে ২৫টি এবং পরে ১০০টি এজেন্সিকে কাজ দেয়া হয়। বাংলাদেশে দুই হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও অধিকাংশই সরাসরি মালয়শিয়ার বাজারে কাজের সুযোগ পায়নি। তাদের চাহিদাপত্র নির্ধারিত এজেন্সির মাধ্যমে এফডাবলইউসিএমএস-এ প্রক্রিয়া করতে হতো।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় মালয়শিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী দাতো সেরি আবদুল আমিনের প্রতিষ্ঠান সিনারফ্লাক্স ও বেস্টিনেটের নামও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। জনশক্তি রফতানিকারকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু সিন্ডিকেট ফি হিসেবে কর্মীপ্রতি দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, চার লাখের বেশি কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি এবং প্রায় আড়াই বছরে মোট ১৮ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে এই বাজার ঘিরে।
এবারের ব্যবস্থায় তাই আশার পাশাপাশি সংশয়ও প্রবল। বিশেষ করে ১০ হাজার কর্মী জিরো-কস্টে পাঠানোর ঘোষণাকে সামনে রেখে দালাল চক্র যাতে সক্রিয় হতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক সরকার। মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারির আগে কোনো কর্মী যেন টাকা না দেন, মেডিকাল পরীক্ষা না করান এবং পাসপোর্ট জমা না দেন।
৩৩৮ এজেন্সিকে সুযোগ দেয়ার সরকারি ব্যাখ্যার বিপরীতে গত ৩১ আগস্ট অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা ১০টি সংগঠন এই ব্যবস্থাকে ‘সিন্ডিকেট’ আখ্যা দিয়ে সংশোধনের দাবি জানিয়েছে। তারা সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ এবং বিশেষ ব্যবস্থায় ১০ হাজার কর্মী নিয়োগের বিষয়ে স্বাধীন যাচাইয়ের দাবি করেছে।
ফলে মালয়শিয়ার শ্রম বাজার ঘিরে এখন একদিকে লাখো কর্ম প্রত্যাশীর নতুন স্বপ্ন, অন্যদিকে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার ছায়া। দুই লাখ কর্মী নেয়ার সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিলে এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্ম সংস্থানের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কতটা স্বচ্ছ, ব্যয়সাশ্রয়ী ও সিন্ডিকেট মুক্ত থাকে— সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।